দুই বাংলাদেশি গবেষকদের চমকপ্রদ উদ্ভাবন
মোবাইল চার্জ হবে ওয়াইফাইয়ের মতো, নিরাময় হতে পারে ডিএনএ’র ‘ক্ষত’

ছবি : সংগৃহীত
১৭ মে ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম
নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে অবস্থানরত দুই বাংলাদেশি গবেষক এমন দুটি ভিন্ন কিন্তু যুগান্তকারী প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন, যা ভবিষ্যতের জীবনযাত্রা বদলে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
মেটার ২০০ কোটি ডলারের উদ্যোগ আটকে দিল চীন
একদিকে ওয়াইফাই সিগন্যালের মতো বাতাসের মাধ্যমে বিদ্যুৎ পরিবহনের প্রযুক্তি, অন্যদিকে মানুষের ডিএনএ-তে অপুষ্টির কারণে তৈরি হওয়া দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বা ‘স্কার’ নিরাময়ের গবেষণা—এই দুই ক্ষেত্রেই কাজ করছেন ড. সাইদুল আলম চৌধুরী ও গবেষক ইউশা আরাফ।
বাতাসেই মোবাইল ও পেসমেকার চার্জ
বর্তমান ওয়্যারলেস চার্জিংয়ের মতো নির্দিষ্ট স্থানে ডিভাইস রাখার প্রয়োজন না করে, নতুন এই প্রযুক্তি ওয়াইফাইয়ের মতো ঘরের যেকোনো জায়গায় বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে সক্ষম হবে। গবেষকরা এই প্রযুক্তির নাম দিয়েছেন “থ্রিডি ওয়্যারলেস চার্জিং”। তারা ইতোমধ্যে “স্মার্ট পাওয়ার বক্স” নামের একটি প্রোটোটাইপ ডিভাইস তৈরি করেছেন। এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে তারা নিউজিল্যান্ডে “রিজোলিংক (Resolinc)” নামে একটি কোম্পানিও প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা বাংলাদেশি মালিকানাধীন প্রথম ওয়্যারলেস পাওয়ার স্টার্টআপ হিসেবে পরিচিত।
ড. সাইদুল আলম চৌধুরীর মতে, এই প্রযুক্তি শুধু মোবাইল নয়, স্মার্ট কিচেন ডিভাইস থেকে শুরু করে শরীরের ভেতরের পেসমেকার বা বায়োমেডিক্যাল ইমপ্ল্যান্ট পর্যন্ত চার্জ দিতে পারবে। এতে বারবার সার্জারির মাধ্যমে ব্যাটারি পরিবর্তনের প্রয়োজনও কমে আসবে। তবে এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড (EMF) নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। গবেষকরা বর্তমানে এ বিষয়েই কাজ করছেন।
ডিএনএ’র ‘মলিকুলার স্কার’ নিরাময়ের গবেষণা
অন্যদিকে গবেষক ইউশা আরাফ কাজ করছেন বায়োলজিক্যাল সায়েন্সের এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে—শিশুদের অপুষ্টির প্রভাব ডিএনএ-তে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে থেকে যায়।মিরপুরের বস্তি এলাকার শিশুদের নিয়ে গবেষণায় তিনি দেখেছেন, শৈশবে অপুষ্টি ডিএনএ-তে কিছু পরিবর্তন তৈরি করতে পারে, যা পরে “মলিকুলার মেমোরি” বা জেনেটিক স্কার হিসেবে থেকে যায়। এই পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে বলেও ধারণা করছেন গবেষকরা।
ইউশা আরাফের লক্ষ্য হলো এই ডিএনএ স্কার শনাক্ত করে তা মুছে ফেলার সম্ভাব্য উপায় খুঁজে বের করা। তার এই গবেষণায় হার্ভার্ড ও অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরাও যুক্ত আছেন এবং প্রকল্পটি বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ অগ্রগতির পর্যায়ে রয়েছে।
অনুপ্রেরণার দুই ভিন্ন পথচলা
ড. সাইদুল আলম চৌধুরীর জন্ম চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে। চুয়েট থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং পরে নিউজিল্যান্ডে গবেষণায় যুক্ত হন। তার নামে ইতোমধ্যে দুইটি মার্কিন পেটেন্ট রয়েছে।
অন্যদিকে ইউশা আরাফ বরিশালের সন্তান। বরিশাল জেলা স্কুল এবং ঢাকা রেসিডেনশিয়াল মডেল কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োটেকনোলজিতে স্নাতক করেন। ছাত্রাবস্থায় তার ৭২টি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে তার গবেষণাকর্মের সাইটেশন সংখ্যা ৩,২৫৬। তিনি জাতিসংঘের ‘বায়ো-সিকিউরিটি ফেলো’ হিসেবে নির্বাচিত প্রথম বাংলাদেশি এবং জেনেভায় বায়োলজিক্যাল ওয়েপন কনভেনশনেও অংশ নিয়েছেন। এছাড়াও তিনি সিলেট ক্যাডেট কলেজ এর ভিজিটিং লেকচারার এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের কোভিড রিসার্চ টিমে গবেষণা সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন।
ভবিষ্যতের লক্ষ্য
নিউজিল্যান্ডে অবস্থানের কারণে পরিচয় ও গবেষণার মাধ্যমে এই দুই গবেষক একসঙ্গে নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ শুরু করেন। বর্তমানে তারা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নেক্সট জেনারেশন ওয়্যারলেস প্যাচ এবং উন্নত রোগ নির্ণয় প্রযুক্তি নিয়েও কাজ করছেন।
গবেষকদের আশা—ভবিষ্যতে তারবিহীন প্রযুক্তি চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও সহজ, দ্রুত ও নিরাপদ করে তুলবে। স্মার্ট হোম থেকে স্মার্ট হাসপাতাল—সব ক্ষেত্রেই এই প্রযুক্তি এক নতুন বিপ্লব আনতে পারে।


