খামেনিসহ শীর্ষ নেতৃত্ব নিশ্চিহ্ন হলে হাল ধরবেন যিনি

ছবি : সংগৃহীত

নিউজ ডেস্ক

০১ মার্চ ২০২৬, ১২:১৯ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনা এবং ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কার প্রেক্ষাপটে আগাম প্রস্তুতি নিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে গুপ্তহত্যা বা সামরিক আঘাতের ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে একটি সুস্পষ্ট ‘মাস্টারপ্ল্যান’ অনুমোদন করেছেন তিনি—যাতে হঠাৎ নেতৃত্বশূন্যতা তৈরি হলেও রাষ্ট্রযন্ত্র অচল না হয়ে পড়ে।


শহিদদের প্রতি ফোঁটা রক্তের বদলা নেবে পাকিস্তান

মার্কিন দৈনিক দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খামেনির অনুপস্থিতি বা জরুরি পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে জাতীয় নিরাপত্তাপ্রধান আলী লারিজানিকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তার ওপর ন্যস্ত থাকবে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষা ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার দায়িত্ব। একই ধরনের তথ্য প্রকাশ করেছে মিডল ইস্ট আই।


প্রতিবেদন অনুযায়ী, যদি কোনো কারণে সর্বোচ্চ নেতা বা শীর্ষ নেতৃত্ব দায়িত্ব পালনে অক্ষম হন কিংবা নিহত হন, তাহলে জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর প্রধান পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। খামেনি নিজেই এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে।

সম্প্রতি হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরাল্লাহ এবং হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়া-এর মতো আঞ্চলিক মিত্র নেতাদের ওপর সফল গুপ্তহত্যার ঘটনা তেহরানকে সতর্ক করেছে। গোয়েন্দা মূল্যায়নে ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের অভ্যন্তরীণ ‘চেইন অব কমান্ড’ বা নেতৃত্ব কাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। এ শূন্যতা এড়াতেই জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের শীর্ষ কর্মকর্তাকে বাড়তি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

রোববার প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বিপ্লবী গার্ড কোর বা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর সদস্য ও উচ্চপদস্থ কয়েকজন কর্মকর্তার বরাত উদ্ধৃত করা হয়। সেখানে বলা হয়, খামেনির নির্দেশনায় সামরিক ও সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর জন্য চার স্তরের উত্তরাধিকার পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো কর্মকর্তা নিহত হলে ধারাবাহিকভাবে তার স্থলাভিষিক্ত হবেন কারা—তা আগেভাগেই নির্ধারণ করা হয়েছে। এমনকি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও নিজেদের অন্তত চারজন সম্ভাব্য উত্তরসূরির নাম প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। 
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, আলী লারিজানি সরাসরি সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার দৌড়ে নেই, কারণ এ পদে অধিষ্ঠিত হতে হলে জ্যেষ্ঠ শিয়া আলেম হওয়া বাধ্যতামূলক। তবে যদি শীর্ষ নেতৃত্ব পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্র পরিচালনায় যোগ্য প্রার্থীদের মধ্যে তিনি অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন।

কে এই আলী লারিজানি? 
আলী লারিজানি বর্তমানে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান এবং গত আগস্টে তাকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি নিয়োগ দেওয়া হয়। এই কাউন্সিলই মূলত দেশটির নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। তেহরানের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর আঘাত এলে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা রক্ষায় যাদের ওপর খামেনি আস্থা রেখেছেন, লারিজানি তাদের মধ্যে অন্যতম বলে মনে করা হচ্ছে। 
এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। যদিও চলতি সপ্তাহে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে, তবু সামরিক প্রস্তুতি ও পাল্টা হুমকির কারণে পরিস্থিতি প্রশমিত হয়নি। সম্প্রতি খামেনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-কে সতর্ক করে বলেছেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ‘ধ্বংস’ করা সম্ভব নয়।
 বিশ্লেষকদের মতে, এই আগাম পরিকল্পনার মাধ্যমে খামেনি আন্তর্জাতিক মহলে দুটি বার্তা দিতে চেয়েছেন। প্রথমত, নেতৃত্ব পরিবর্তন হলেও ইরানের নীতি ও প্রতিরোধব্যবস্থা দুর্বল হবে না। দ্বিতীয়ত, শত্রুপক্ষকে বোঝানো যে শীর্ষ নেতাদের হত্যা করলেও রাষ্ট্রযন্ত্র অচল করে দেওয়া যাবে না।

উল্লেখ্য, গত বছর জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনব্যাপী সংঘাতের সময় খামেনি সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে তিনজনের নাম প্রকাশ করেছিলেন। ফলে উত্তরাধিকার প্রশ্নে তেহরান আগেই প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছিল।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব ইরানের এই সাংগঠনিক বিন্যাস গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ৮৬ বছর বয়সী খামেনি এখন যুদ্ধক্ষেত্রের প্রস্তুতির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন বলেই বিশ্লেষকদের মত।

অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিলেও তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য স্পষ্ট নয়। বার্তাসংস্থা এএফপি জানিয়েছে, হামলার হুমকি দেওয়া হলেও সম্ভাব্য সংঘাতের কৌশল বা মেয়াদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পরিষ্কার বার্তা দেয়নি। ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধজাহাজ ও বহু যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্র কি আইআরজিসির ওপর সীমিত আঘাত হানতে চায়, নাকি ইসরায়েলের প্রত্যাশা অনুযায়ী ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করতে চায়? এমনকি তেহরানে সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টাও কি পরিকল্পনার অংশ? যদিও তেহরান আগেই সতর্ক করেছে—যে কোনো হামলার জবাবে কঠোর প্রতিশোধ নেওয়া হবে। ফলে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও এখন সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।