সরকার ও রাজনৈতিক শক্তি মুখোমুখি

প্রতীকী ছবি

এসএম ফজলুল হক (বিশেষ প্রতিবেদক)

০২ নভেম্বর ২০২৫, ০২:২২ পিএম

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে তীব্র উত্তেজনা। মুখোমুখি অবস্থানে দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি—বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা ও নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে সবপক্ষই। সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত, সংস্কার প্রক্রিয়া ও নির্বাচন ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্ক এখন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। জনগণের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ।


এতিম তারেক রহমান, জনতার অভিভাবক

দেশের প্রায় ৭৮ শতাংশ মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী দুটি দল—আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করলেও বর্তমানে তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিকট উপেক্ষিত। আইনগত বাধার কারণে নির্বাচনসংক্রান্ত কার্যক্রমে আওয়ামী লীগের মতামত প্রদানের সুযোগ সীমিত হলেও বিএনপির প্রস্তাব ও মতামতও যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। এর ফলে সরকারের প্রতি জনগণের প্রতিক্রিয়া দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে।


জুলাইয়ের গণসংস্কার ও গণভোট, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে সরকার। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ে জাতি এখন অনিশ্চয়তার অন্ধকারে রয়েছে। সংস্কার কমিটির দাখিলকৃত সংশোধনী প্রস্তাব ও সুপারিশ বাস্তবায়নে সাংবিধানিকভাবে অক্ষম অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনে সরকারের কঠোর অবস্থান ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে প্রাণহানির ঘটনাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এই সুযোগ কাজে লাগাতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো।

শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আগের সরকারের প্রভাবশালী তিন ব্যক্তি—সাবেক আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক, প্রধানমন্ত্রীর শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং তথ্য প্রতিমন্ত্রী আরাফাত রহমান—গোপনে যোগাযোগ রাখেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক এক উপমন্ত্রী ও প্রাক্তন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়। ২০২২ সাল থেকেই আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরিকল্পনা চললেও বিষয়টি টের পাননি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অভাবে ২০০৬ সালের পর থেকে দেশ কার্যত দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক স্থবিরতায় ভুগছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিন দিন দেশ ছিল সরকারহীন। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

দেশের প্রায় ৭৮ শতাংশ মানুষের দাবি—নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে পছন্দের সরকার গঠন। জনদাবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দ্রুত নির্বাচন কমিশন গঠন করে। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি ও কার্যক্রমে দেশি–বিদেশি মহলে আশাবাদ সৃষ্টি হয়।

নির্বাচনপূর্ব জনমত জরিপে অংশ নেয় সরকার ও বড় রাজনৈতিক জোটগুলো। দেশি–বিদেশি সরকারি ও বেসরকারি একাধিক জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৬৫ শতাংশ জনসমর্থন বিএনপির পক্ষে। এতে অস্বস্তিতে পড়ে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামি, সদ্য গঠিত এনসিপি ও আরও কয়েকটি ছোট দল। তারা নির্বাচনের বিলম্ব ঘটিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

কৃতজ্ঞতার ঋণ শোধে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিছু রাজনৈতিক ফাঁদে পা দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে নির্বাচনের পদ্ধতি ও সময় নির্ধারণে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোতে। জবাবদিহিতার ভয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অনেক বিষয়ে অস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে।

দেশের বৃহত্তম দুই রাজনৈতিক দল—বিএনপি ও আওয়ামী লীগ—কে ঘিরে সরকারের কিছু পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনুস অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এমনকি তিনি প্রয়োজনে পদত্যাগেরও ইঙ্গিত দিয়েছেন।

নির্বাচনের পদ্ধতি ও আইনসভার ধরন নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যেই সরকার নতুন সংস্কার কর্মসূচি চালু করেছে। সরকারের পরোক্ষ মদদে রাজপথে সক্রিয় রয়েছে কয়েকটি রাজনৈতিক দল। তবে এসব দলের জনসমর্থন খুবই সীমিত। ফলে সরকারও পছন্দের দলগুলোকে সমর্থন দিয়ে রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে।

জনমত জরিপে ফলাফল আশানুরূপ না হওয়ায় নির্বাচনমুখী কার্যক্রম থামিয়ে দিতে চাচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার—এমন অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে নাটকীয়তা বাড়ছে প্রতিনিয়ত।

নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২০২৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করলেও নানান বিতর্কে জনগুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় স্থবির হয়ে পড়েছে। সরকারের কিছু পদক্ষেপ জনস্বার্থবিরোধী হওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার প্রধান ড. ইউনুস অবশেষে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তবে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামী ও নবগঠিত এনসিপি এই আলোচনায় আপত্তি জানায়।

অজনপ্রিয় কিছু রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার লোভে নিজেদের অবস্থান ভুলে যাচ্ছে। তারা নতুন নতুন দাবি ও প্রচারণার মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচন হতে পারে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট কাঠামোয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যম আয়ের বাংলাদেশের আর্থিক কাঠামো ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন সংসদব্যবস্থা অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অপ্রয়োজনীয়।