সংসদ-গণভোটে আর্থিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা

ছবি : সংগৃহীত

এসএম ফজলুল হক (বিশেষ প্রতিবেদক)

০২ নভেম্বর ২০২৫, ০৪:৫১ পিএম

বাংলাদেশে একই সময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু হলেও, দেশের বর্তমান আর্থিক অবস্থায় এই বিশাল ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব হবে কি না- এ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে সচেতন মহলে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের আর্থিক সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ; তাই দুইটি জাতীয় নির্বাচনের ব্যয় একসাথে মেটানো দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।


অবশেষে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাচ্ছেন মোহন রায়হান

দেশে বর্তমানে একাধিক মেগা প্রকল্পের কাজ বন্ধ বা স্থগিত রয়েছে। পর্যাপ্ত আর্থিক সঙ্গতি থাকলে এসব উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড কেন বন্ধ রয়েছে—এমন প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা।


অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের কোষাগারে যে আর্থিক ঘাটতি চলছে, তাতে করে সংসদ ও গণভোট—এই দুই বৃহৎ নির্বাচনের ব্যয়ভার বহন করা প্রায় অসম্ভব। বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি স্বনির্ভর নয়।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শুরু হওয়া বেশ কিছু প্রকল্প, যেমন উত্তরা থেকে আশুলিয়া ইপিজেড পর্যন্ত ফ্লাইওভার প্রকল্পের ৭০% কাজ শেষ হলেও, বাকি ৩০% কাজ অর্থ সংকটে ঝুলে আছে। এই অবস্থায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কীভাবে দ্বৈত নির্বাচন আয়োজন করবে, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

গণভোটের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন

জাতীয় সংসদই যেহেতু সাংবিধানিক সংশোধন ও নতুন আইন প্রণয়নে সক্ষম, তাহলে আলাদা করে ব্যয়বহুল গণভোট আয়োজনের প্রয়োজন কেন—এই প্রশ্ন তুলছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, গণভোট আয়োজনকে কেন্দ্র করে জাতি ইতিমধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটি অংশ এই গণভোটে আগ্রহী হলেও অন্য অংশ এটি অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও বিভ্রান্তি বলে মনে করছে।

বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য, ইউরোপীয় দেশগুলোর মতো শক্তিশালী মুদ্রাব্যবস্থা বাংলাদেশে নেই। নিম্নমুখী মুদ্রামূল্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, এবং জনগণের ক্রমবর্ধমান দুর্ভোগ—সবমিলিয়ে এ মুহূর্তে গণভোট আয়োজন অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বামজোট সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দায়িত্ব নেয় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। দেশি-বিদেশি গণতন্ত্রকামী মানুষের প্রত্যাশা ছিল—এই সরকার শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করবে। কিন্তু এখন সরকারের মনোযোগ গণভোট আয়োজনের দিকে চলে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, এটি কি জাতীয় স্বার্থে, নাকি কোনো বিশেষ মহলের প্রয়োজনে?

অর্থনীতিবিদ ড. ইউনূস নিজেই যখন জানেন দেশের সীমিত আর্থিক সামর্থ্য, তখন একই সঙ্গে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্তকে অনেকে ‘অবাস্তব ও বিপজ্জনক’ বলেই মনে করছেন।

স্মরণ করা প্রয়োজন, ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমেই রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা থেকে বাংলাদেশ সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে আসে। তখন গণভোট ছাড়াই সংসদ সদস্যদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে সংবিধান সংশোধন হয়েছিল।

তাই প্রশ্ন উঠছে—এখন কেন আবার গণভোটের পথে যেতে হবে? এটি কি জাতিকে আরও বিভক্ত করবে না?

বিশ্লেষকদের মতে, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার যদি সত্যিকারের নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ প্রমাণ করতে চায়, তবে গণভোট আয়োজনের মতো বিতর্কিত উদ্যোগ থেকে সরে আসতে হবে। অন্যথায়, এই উদ্যোগ সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলেও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

দেশের আর্থিক অবস্থা টানাপোড়েনের মধ্যে, মুদ্রাস্ফীতি ক্রমবর্ধমান, উন্নয়ন প্রকল্প স্থগিত—এমন পরিস্থিতিতে দুইটি জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে। জাতীয় স্বার্থে, সরকারের উচিত হবে—অর্থনৈতিক বাস্তবতা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনবোধে গণভোট আয়োজন থেকে বিরত থাকা এবং একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে মনোযোগী হওয়া।