সংঘাতের পথে বাংলাদেশ

প্রতীকী ছবি
১১ নভেম্বর ২০২৫, ১২:৪০ পিএম
গণভোট প্রশ্নে সরকারের নির্ধারিত সাত দিনের সময়সীমা গতকাল শেষ হলেও এখনো এক টেবিলে বসেনি দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো। এর ফলে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ ঝুলে আছে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দিক-নির্দেশনার ওপর। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পদ্ধতি, ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ এবং আসন্ন গণভোটকে কেন্দ্র করে যেমন রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠছে তেমনি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ অভিযুক্তদের রায় ঘোষণার প্রাক্কালে অনলাইন-অফলাইনে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
মওলানা ভাসানীর মৃত্যুবার্ষিকী আজ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটে। এর তিনদিন পর ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী ড. ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার ছিল—শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচন আয়োজন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর।
প্রাথমিকভাবে সব রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও নির্বাচনের প্রস্তুতিতে সহযোগিতা করলেও জনমত জরিপে অনুকূল ফল না পাওয়ায় কিছু দল নির্বাচনী গতি থামিয়ে দেয়। অন্যদিকে, কিছু রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠন সরকারবিরোধী আন্দোলনের নতুন কৌশল নেয়।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে প্রাণহানির বিচার এবং আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবিতে নতুন করে সরব হয় কিছু সংগঠন। সরকারের পদক্ষেপে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা গতি পায়। আগামী ১৩ নভেম্বর এই মামলার রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ঐতিহাসিক সেই রায়কে কেন্দ্র করে সরকার ও আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ মহলে উত্তেজনা এখন দৃশ্যমান। প্রতিবেশী দেশ ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনের খবরও মিলেছে কূটনৈতিক মহল থেকে।
অন্যদিকে, সংসদ নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে জটিলতা বাড়ছে। নির্বাচনে পিআর (Proportional Representation) পদ্ধতি গ্রহণ নিয়ে বিতর্ক ছড়িয়েছে। ঐক্যমত কমিশনের জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলাম ও সমমনাদের নেতৃত্বে বৃহত্তর জোট এখন আন্দোলনমুখী অবস্থানে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রক্ষমতা পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষায় প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো আজ একে অপরের প্রতি অবিশ্বাসে জর্জরিত। জনমত জরিপে প্রতিকূল ফলাফলের পরও অনেক দল স্বপ্ন দেখছে ক্ষমতায় ফেরার। ফলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এখন চরম চাপের মুখে—একদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়, অন্যদিকে আসন্ন গণভোট ও সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশ আজ অনিশ্চিত রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। গণভোট, নির্বাচন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের রায়কে ঘিরে দিশেহারা দেশ।
এদিকে, আ’লীগ ঘোষিত ১৩ নভেম্বরের ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচি সম্পর্কে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘সরকার প্রস্তুত আছে। জনগণের জানমাল রক্ষায় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা হতে দেওয়া হবে না।’ এর আগে গত ৫ নভেম্বর কিছু গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়, সেনাবাহিনীর মাঠ পর্যায়ের ৫০ শতাংশ সদস্যকে বিশ্রাম ও নির্বাচনকালীন প্রশিক্ষণের জন্য সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়া হবে। ৪ নভেম্বরের কোর কমিটির সভায় এমন সিদ্ধান্ত হয়।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন ফেসবুক পেজে গণঅভ্যুত্থানে পালিয়ে যাওয়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা ঢাকা শহরে বিশৃঙ্খলা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের কর্মীদের নির্দেশনা দিচ্ছেন। এ জন্য ফেসবুক গ্রুপ ও ভিডিও বার্তা নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, ‘একটা ফেসবুক গ্রুপ বন্ধ করা হলে আরও একাধিক ভুয়া ফেসবুক গ্রুপ চালু করা হচ্ছে। এ জন্য ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করছে সরকার।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, ‘সামাজিক মাধ্যমে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মসূচি ঘোষণা নজরে এসেছে। এসব বিষয়ে পুলিশি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আমরা সতর্ক আছি। এ নিয়ে নগরবাসীর আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।’


