জামায়াতের উত্থান যেসব কারণে

ছবি : সংগৃহীত

নিউজ ডেস্ক

১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৩:৩০ পিএম

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবারের নির্বাচনে ২৯৯টি আসনের মধ্যে দলগতভাবে ৬৮টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। দলটির নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের শরিক এনসিপি ৬টি, খেলাফত মজলিস ৩টি মিলিয়ে জোটগতভাবে তারা আসন পেয়েছে ৭৭টি। শতকরা হিসাবে দলটি এবার ভোট পেয়েছে ২৭ শতাংশ। প্রাপ্ত আসন এবং ভোটের এই হিসাবে দলটি সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে আরও ১৩টি এবং সংসদের প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষে ২৭টি আসন পেতে যাচ্ছে। ২০০৮ সালে মাত্র ২টি আসন পাওয়া দলটি এবার সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল হতে যাচ্ছে। জামায়াত ১৯৯১ সালে ১৭টি এবং ২০০১ সালে বিএনপির সঙ্গে চারদলীয় জোটে থেকে ১৮টি আসনে বিজয়ী হয়। এবারই প্রথম দলটি এতসংখ্যক আসনে বিজয় লাভ করে। ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, কমপক্ষে ৫৩টি আসনে জামায়াত প্রার্থীরা ২ হাজারেরও কম ভোটের ব্যবধানে হেরে গেছেন। অন্যদিকে দলের মুখপাত্র অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জোবায়ের দাবি করেছেন, জামায়াত জোটকে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় সংখ্যক আসনে বিজয়ী করেছে জনগণ। কিন্তু ফলাফল টেম্পারিং করে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী দলটির এবারের এই উত্থান নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ।


জুলাই সনদে সই করেনি যেসব দল

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াতের এই উত্থানের পেছনে রয়েছে ৭টি কারণ।


এর মধ্যে একটি হলো-অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা জামায়াতের সবচেয়ে বড় শক্তি। আমির থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন ইউনিট পর্যন্ত গণতান্ত্রিকভাবে দলের নেতা নির্বাচনের মাধ্যমে দলটির ভেতরের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এতে দলের কর্মী ও সমর্থক সংখ্যা প্রতিবছর বাড়ছে ব্যাপক হারে। রাস্তায় মিছিল-মিটিং ছাড়াও তাদের অভ্যন্তরীণ দায়িত্ব ও কার্যক্রম অনেক বিস্তৃত হয়েছে, যা সারা বছরই চলে। করোনার সময় এবং ফ্যাসিবাদী আমলে তারা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দলের কার্যক্রম এগিয়ে নেয়। কখনোই দলের কার্যক্রম থেমে থাকেনি।

বিশ্লেষকরা আরও মনে করেন, এবারের নির্বাচনে জামায়াত ভোটারদের ‘সিমপ্যাথি’ পেয়েছে ফ্যাসিস্ট আমলে দলের শীর্ষ নেতাদের অন্যায়ভাবে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করায়। এসব নেতা ব্যক্তিগতভাবে সৎ ও ভালো মানুষ ছিলেন। তাদের মধ্যে মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ মন্ত্রী থাকাকালে দুর্নীতিমুক্ত ছিলেন। হাসিনার আমলে দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী হামলা, মামলা, গুম-খুনের শিকার হয়েছেন। এ কারণে সাধারণ মানুষের সহানুভূতি পেয়েছে দলটি।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে পরোক্ষ নেতৃত্বে ছিল জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির। জুলাই-পরবর্তী এই নির্বাচনে জুলাই যোদ্ধা হিসাবে দলটি এগিয়ে গেছে অনেক। বিগত দেড় বছরে তারা যত নির্বিঘ্নে সাংগঠনিক ও কল্যাণমূলক কাজ করার সুযোগ পেয়েছে, অতীতে কখনো এমনটা পায়নি। এই সময়ের মধ্যে দলটি যেমন জনকল্যাণমুখী অনেক কাজ করার সুযোগ পেয়েছে, তেমনই বরাবরই বৈরী অবস্থানে থাকা মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার পেয়েছে।

তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ জুলাই অভ্যুত্থানের পর জামায়াতের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। দেশের শীর্ষ ৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের ভূমিধস বিজয় জাতীয় নির্বাচনেও প্রভাব ফেলেছে। তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জামায়াতের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে ভোটের মাঠে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ভারতীয় মিডিয়ায় বিভিন্ন স্থানে মন্দিরে হামলার অপপ্রচার করা হলেও জামায়াতকর্মীরা রাত জেগে মন্দির পাহারা দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, জামায়াত ভারতের বিজেপির মতো কোনো উগ্র সাম্প্রদায়িক দল নয়। দেশে-বিদেশে দলটি একটি মডারেট ইসলামি গণতান্ত্রিক দল হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে।

ভারতবিরোধিতা জামায়াতের একটি বড় পুঁজি। ফ্যাসিস্ট আমলে এদেশ দিল্লির ‘অঘোষিত ইচ্ছায়’ যখন চলছিল, তার বিরুদ্ধে জুলাই অভ্যুত্থানের ছাত্র-ছাত্রীরা ফুঁসে উঠেছিল। জামায়াত সব সময়ই ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছে।

ভালো ফলের কারণ বিশ্লেষণে আরও জানা যায়, অন্যান্য দল ভোটের কয়েকদিন আগে প্রার্থী ঘোষণা করলেও জামায়াত এক বছর আগেই ৩০০ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করে ভোটের ময়দানে সবার আগে অবস্থান নেয়। ফলে তারা ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাওয়ার ব্যাপক সুযোগ পায়। এর ফল পেয়েছে নির্বাচনে। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এবং জাতীয় পার্টির নাজুক অবস্থা রাজনৈতিক ময়দানে জামায়াতকে সুবিধাজনক অবস্থানে নিতে সহায়তা করেছে। ফলে ভোটের মাঠে বিএনপির প্রায় ‘প্যারালাল’ অবস্থানে চলে আসে দলটি।

সর্বোপরি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরের ১৭ মাসে দলের আমির ডা. শফিকুর রহমানের কথা ও কার্যক্রম জনগণের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিদেশে না গিয়ে দেশেই নিজের হার্টের বাইপাস সার্জারি করিয়ে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি এখন জামায়াতের একজন ‘ক্যারিশম্যাটিক’ লিডারে পরিণত হয়েছেন।