চীন সফরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি কী?

ছবি : সংগৃহীত
২৮ জুন ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের চার মাসের মাথায় প্রথম বিদেশ সফরে যান। মালয়েশিয়া সফর শেষে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীন গিয়ে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। সফর শেষে প্রশ্ন উঠেছে—এই সফরে আসলে কী অর্জন করলো বাংলাদেশ?
টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক, তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট
সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দুই দেশ তাদের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতদিন বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক ছিল ‘সামগ্রিক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্ব’ পর্যায়ে। এবার সেটিকে উন্নীত করে ‘চীন-বাংলাদেশ কমিউনিটি উইথ অ্যা শেয়ার্ড ফিউচার’ বা অভিন্ন ভবিষ্যতের অংশীদারিত্বে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কূটনীতিকদের মতে, এটি চীনের সঙ্গে সম্পর্কের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি কাঠামো, যা বেইজিং কেবল ঘনিষ্ঠ অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গেই প্রতিষ্ঠা করে।
সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দুই দেশের মধ্যে মোট ১৭টি সমঝোতা ও সহযোগিতা দলিল সই হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন সমঝোতা স্মারক, চুক্তি, একটি প্রোটোকল এবং একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা। এসবের আওতায় উন্নয়ন সহযোগিতা, বিনিয়োগ, শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বাণিজ্য, সংস্কৃতি এবং সবুজ উন্নয়নের মতো খাতগুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
অবকাঠামো উন্নয়নেও এসেছে নতুন অগ্রগতির ইঙ্গিত। মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ, চট্টগ্রামে চীনা শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। পাশাপাশি বন্দরভিত্তিক মাল্টিমোডাল যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
বহুল আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনাতেও ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। চীন প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও কারিগরি সহায়তা দিতে সম্মতি জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভাব্যতা সমীক্ষাই বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এছাড়া নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ড্রেজিং এবং পানি সম্পদ উন্নয়নেও সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ।
বাংলাদেশের বহুপাক্ষিক কূটনীতিতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ব্রিকস, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও) এবং আরসিইপিতে বাংলাদেশের সদস্যপদের প্রচেষ্টায় সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে চীন। একইসঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতেও বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে বেইজিং।
এই সফরের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে চীনের বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ—গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ বা জিডিআইতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। কয়েক বছর ধরে আলোচনা চললেও এবারই প্রথম এ বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে উন্নয়ন, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও দক্ষতা বৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, দুই দেশের পররাষ্ট্র দপ্তরের সম্পর্কও আরও শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সচিব পর্যায়ের বৈঠককে উন্নীত করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের কৌশলগত সংলাপে নেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াতে ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ চালুর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
সফরের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ থেকে চীনে টাটকা কাঁঠাল রপ্তানির পথ উন্মুক্ত করতে প্রোটোকল সই হয়েছে। এছাড়া গণমাধ্যম, শিক্ষা, ভাষা শিক্ষা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, বিনিয়োগ এবং শিল্প উন্নয়নেও একাধিক সমঝোতা হয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সফরের সাফল্য শুধু চুক্তির সংখ্যায় নয়, বরং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ভিত্তি কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ প্রতিশ্রুতি যত বড়ই হোক, তার বাস্তব ফল নির্ভর করবে বাংলাদেশের প্রস্তুতি, বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং ধারাবাহিক উদ্যোগের ওপর।
এখন দেখার বিষয়, চীন সফরে পাওয়া এই প্রতিশ্রুতি ও সমঝোতাগুলো কত দ্রুত বাস্তব প্রকল্পে রূপ নেয় এবং সেগুলো দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও আঞ্চলিক সংযোগে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।


