‘ফাঁসির মঞ্চ’ থেকে সংসদে যারা

ছবি : সংগৃহীত
১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৪:৫৯ পিএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেছে। এমন তিন প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, যারা গত সরকারের আমলে দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন এবং পৃথক মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আন্দোলন-পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তারা মুক্তি পান এবং এবার ভোটের মাঠে অংশ নিয়ে জয় ছিনিয়ে আনেন।
বিএনপির শেষ নির্বাচনি জনসভা ৮ ফেব্রুয়ারি
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর তাদের মামলাগুলো নতুন করে আইনি পর্যালোচনার আওতায় আসে। পরবর্তীতে আদালতের রায়ে তারা খালাস পান এবং কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন। এরপর নিজ নিজ এলাকায় সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে যান এবং নির্বাচনে প্রার্থী হন। ভোটাররা তাদের বিপুল ভোটে বিজয়ী করে সংসদে পাঠিয়েছেন।
নেত্রকোনা ৪ আসনে লুৎফুজ্জামান বাবর
লুৎফুজ্জামান বাবর দীর্ঘ ১৮ বছর কারাগারে ছিলেন। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার মামলায় তাকে ২০০৭ সালে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তী সময়ে ওই মামলায় তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হয়। দীর্ঘ কারাবাসের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি মুক্তি পান।
কারামুক্তির পর নিজ এলাকা নেত্রকোনায় ফিরে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে নেত্রকোনা ৪ (মোহনগঞ্জ, মদন, খালিয়াজুরি) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। চূড়ান্ত ফলাফলে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে এক লাখ ২০ হাজারের বেশি ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, দীর্ঘ কারাবাস ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তার পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছে।
টাঙ্গাইল ২ আসনে আবদুস সালাম পিন্টু
আবদুস সালাম পিন্টু একই গ্রেনেড হামলা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছিলেন। প্রায় ১৭ বছর কারাগারে কাটানোর পর ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর তিনি মুক্তি পান। মুক্তির পর নিজ জেলা টাঙ্গাইলে ফিরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করেন।
টাঙ্গাইল ২ (গোপালপুর-ভূঞাপুর) আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন তিনি। নির্বাচনে প্রায় দুই লাখ ভোট পেয়ে জয়ী হন। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তার পক্ষে সহানুভূতিশীল ভোট ও দলীয় সংগঠনের সক্রিয়তা বড় ভূমিকা রেখেছে।
রংপুর ২ আসনে এটিএম আজহারুল ইসলাম
এটিএম আজহারুল ইসলাম ২০১২ সাল থেকে এক যুগের বেশি সময় কারাবন্দি ছিলেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছিল। ২০২৪ সালের ২৮ মে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান।
রংপুর ২ (তারাগঞ্জ-বদরগঞ্জ) আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। এ আসনে তিনি বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীকে পরাজিত করেন। তার বিজয়কে অনেকেই উত্তরাঞ্চলের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ হিসেবে দেখছেন।
এই তিন নেতার নির্বাচনী সাফল্য দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। একসময় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হিসেবে কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের জনগণ ভোটের মাধ্যমে সংসদে পাঠিয়েছে— এটি দেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ফলাফল শুধু ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তনের গল্প নয়; বরং এটি সামগ্রিক রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের অংশ। দীর্ঘ কারাবাস, বিতর্কিত বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে জনমত এবং সাম্প্রতিক আন্দোলনের প্রভাব সব মিলিয়ে ভোটাররা ভিন্নধর্মী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।
সংসদের নতুন অধিবেশনে তাদের ভূমিকা কী হবে, তারা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবেন; এখন সে দিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, ফাঁসির দণ্ড থেকে ফিরে আসা এই তিন নেতাকে জনগণ এবার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নতুন দায়িত্ব দিয়েছে।


