ভোটের মাঠে ঋণখেলাপি ৪৫ প্রার্থী

প্রতীকী ছবি

নিউজ ডেস্ক

২২ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:৩৭ পিএম

ঋণখেলাপি হওয়া সত্ত্বেও অন্তত ৪৫ জন প্রার্থী এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। যদিও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও)সহ বিভিন্ন আইনে ঋণখেলাপিদের প্রার্থীতা ঠেকানোর স্পষ্ট বিধান রয়েছে, তবু এসব বাধা অতিক্রম করে ৪৫ জন টিকে গেলেও ৬৮ জন প্রার্থী বাদ পড়েছেন। এ পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বাছাই প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন কমিশন-এর আপিল শুনানি শেষ হয়েছে। এখন পরবর্তী ধাপে উচ্চ আদালতে আইনি লড়াই শুরু হতে যাচ্ছে। ঋণখেলাপির অভিযোগে প্রার্থীতা বাতিল হওয়া অনেকেই ইতোমধ্যে উচ্চ আদালতে আইনি প্রতিকার নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।


সোনার দাম বাড়ল ভরিতে ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা

বাংলাদেশ ব্যাংক-এর ঋণ তথ্য ব্যুরো (সিআইবি) তালিকায় ঋণখেলাপি হিসেবে নাম থাকলেও মনোনয়নপত্র দাখিলের আগেই ৩১ জন প্রার্থী উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বাছাইয়ে এ ৩১ জনের মধ্যে কুমিল্লা-৪ আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত প্রার্থী নির্বাচন কমিশন-এর আপিল শুনানিতে বাদ পড়েন। হাইকোর্টের আদেশ আপিলে স্থগিত হয়ে যাওয়ায় তিনি পুনরায় ঋণখেলাপির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন। এদিকে ইসির আপিল শুনানিতে ঋণখেলাপি প্রার্থীদের বিষয়ে পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে। গত রোববার শুনানি শেষে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, মনে কষ্ট নিয়েই তারা কিছু ঋণখেলাপি প্রার্থীকে ছাড় দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা যাদের ঋণখেলাপি হওয়া সত্ত্বেও ছাড় দিয়েছি, তা মনে কষ্ট নিয়েই করেছি। তবে আইন যেহেতু অনুমতি দিয়েছে, সে কারণেই তা করতে হয়েছে।’


ঋণখেলাপির অভিযোগে চট্টগ্রাম-২ আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রার্থী সারোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বৈধতার বিরুদ্ধে করা আপিল মঞ্জুর করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল চেয়ে দুটি ব্যাংক ইসিতে আপিল করলেও শুনানি শেষে তা খারিজ করা হয়। সিদ্ধান্ত ঘোষণার সময় নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ প্রার্থীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘মনোনয়নপত্র বৈধ করলাম, ব্যাংকের টাকাটা দিয়ে দিয়েন।’

এ তালিকায় শুধু বিএনপির প্রার্থীরাই নন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর অনুপস্থিতিতে এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উঠে আসা জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরাও রয়েছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বাছাইয়ে ঋণখেলাপির কারণে বাতিল হওয়া ৮২ জনের মধ্যে ইসির আপিল শুনানিতে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন ১৫ জন। তাঁদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর দুজন এবং চরমোনাইপন্থী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর দুজন প্রার্থী রয়েছেন। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার আগেই ঘোষণা দিয়েছিল, এবারের নির্বাচনে কোনো ঋণখেলাপি প্রার্থী অংশ নিতে পারবেন না।

বিগত কয়েকটি এক তরফা নির্বাচনে আদালতের স্থগিতাদেশ কিংবা ঋণখেলাপির তথ্য গোপন করে অনেকেই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়ে যান। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ঘটে। ওই নির্বাচনের ঠিক আগে ঋণের তথ্য হালনাগাদের ক্ষমতা ব্যাংকগুলোর হাতে ছেড়ে দিয়ে ওই সুযোগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে এবার কোনো ঋণখেলাপি যেন নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে সে বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে দিকনির্দেশনা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এছাড়া এবার আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়েও কোনো ঋণখেলাপি যেন নির্বাচন করতে না পরেন সে ব্যবস্থা করার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। যদিও শেষ পর্যন্ত তা আর সফল হয়নি।

জানতে চাইলে সম্প্রতি ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে কেউ যেন নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে আমরা সেটা চেয়েছিলাম। তবে এ জন্য আইন পরিবর্তন করা দরকার। সেই ক্ষমতা তো আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেই। 

তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট থেকে কেউ আইনি প্রতিকার নিয়ে এলে সেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু করার নেই। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ গত আগস্টে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাংকের ঋণখেলাপিরা অংশ নিতে পারবেন না। নির্বাচন কমিশনের উচিত ঋণখেলাপিদের শনাক্ত করা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আদালতের স্টে অর্ডার নিয়ে।

ঋণখেলাপি হওয়া সত্ত্বেও উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের মাধ্যমে এবার ৩১ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। এদের মধ্যে ১৫ জন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র। তবে কুমিল্লা-৪ আসনের বিএনপির প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর প্রার্থিতা আপিল শুনানিতে বাতিল হয়েছে। তিনি ঋণখেলাপি হওয়ায় উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়েছিলেন। ঋণ খেলাপি তথ্য প্রকাশ না করার জন্য আদালত তাকে ৭ মার্চ পর্যন্ত স্থগিতাদেশ দিয়েছিল। সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা এই স্থগিতাদেশের ভিত্তিতে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছিলেন, যদিও নির্বাচনী হলফনামায় তিনি কোনো ঋণ নেই উল্লেখ করেন। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এই আসনের ন্যাশনাল পার্টি প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ ইসিতে আপিল করেন। শুনানি শেষে ১৭ জানুয়ারি মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর প্রার্থিতা বাতিল করা হয়। অন্যদের, যারা উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়েছেন, তাদের প্রার্থিতা এখনও বহাল রয়েছে।

ঋণখেলাপির কারণে ৮২ জন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করেছিলেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা। তবে তাদের মধ্যে ১৫ জন প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। প্রার্থিতা ফিরে পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর দুজন প্রার্থী রয়েছেন। যশোর-২ আসনের মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ প্রাইম ব্যাংকে তাঁর ক্রেডিট কার্ডের ঋণ খেলাপি ছিল। নির্ধারিত সময়ের পর ১ জানুয়ারি ব্যাংকের সমস্ত পাওনা পরিশোধ করে তিনি খেলাপিমুক্ত হন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের পরে খেলাপিমুক্ত হওয়ায় জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা তাঁর প্রার্থিতা বাতিল করেছিলেন। পরে ১৮ জানুয়ারি ইসিতে আপিল করে তিনি প্রার্থিতা ফিরে পান। দলটির আরেক প্রার্থী কর্নেল (অব.) মো. আব্দুল হক, ঢাকা-২ আসনের প্রার্থী। তিনি জনতা ব্যাংকের খেলাপি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির পরিচালক হওয়ায় রিটার্নিং কর্মকর্তা তাঁর মনোনয়ন বাতিল করেছিলেন। তবে ১৩ জানুয়ারি হাইকোর্টের রায়ে তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের দুজন হলেন– যশোর-৩ থেকে মুহাম্মদ শোয়াইব হোসেন ও ময়মনসিংহ-৬ থেকে মো. নূরে আলম সিদ্দিকী। জাতীয় পার্টির নীলফামারী-৩ থেকে মো. রোহান চৌধুরী, গণঅধিকার পরিষদের খাগড়াছড়ির দীনময় রোয়াজা, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চাঁদপুর-২ থেকে নাসিমা নাজনিন সরকার ও এনপিপির বরগুনা-২ থেকে মো. সোলায়মান। প্রার্থিতা ফিরে পাওয়াদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী সাতজন হলেন– খুলনা-৩ আসনের এস এম আরিফুর রহমান মিঠু, ঝালকাঠি-১ আসনের মো. মোস্তাফিজুর রহমান, ময়মনসিংহ-১০ আবু বকর সিদ্দিকুর রহমান, কিশোরগঞ্জ-৩ একেএম আলমগীর, মানিকগঞ্জ-২ এস এম আব্দুল মান্নান, ঢাকা-১ থেকে সাবেক মন্ত্রী নাজমুল হুদার মেয়ে অন্তরা সেলিমা হুদা ও গোপালগঞ্জ-২ থেকে উৎপল বিশ্বাস। ঋণখেলাপি হিসেবে বাতিল হওয়া অন্য ৬৭ জনের বাতিলই রয়েছে।

কুমিল্লা-১০ আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠান ব্যাংক এশিয়ায় ঋণ খেলাপি হওয়ায় তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। একই আসনে দলটির আরেক প্রার্থী মো. আবদুল গফুর ভূঁইয়ারও মনোনয়ন পেতে ব্যর্থ হয়েছেন। ঋণখেলাপির কারণে বিএনপির মনোনীত যশোর-৪ আসনের টি এস আইয়ুবের মনোনয়নপত্রও বাতিল করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা, এবং পরবর্তী আপিলেও তা বহাল থাকে। তাঁর মালিকানাধীন সাইমেন্স লেদার প্রোডাক্টস ঢাকা ব্যাংকের খেলাপি। তবে এই আসনে দলটির আরেক প্রার্থী মতিয়ার রহমান ফরাজীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম-১১ আসনে একেএম আবু তাহেরের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে, কিন্তু দলটির মূল প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মনোনয়ন বৈধ হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম-১৪ থেকে আলহাজ জসীম উদ্দীন আহমেদ নির্ধারিত তারিখের পরে ৩০ ডিসেম্বর খেলাপিমুক্ত হয়েছেন। যেহেতু তিনি আগেই টাকা পরিশোধ করেছিলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তা তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছেন।