ফের গতি ফিরেছে চট্টগ্রাম বন্দরে

ছবি : সংগৃহীত
১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৫:২৩ পিএম
শ্রমিক-কর্মচারীদের ধর্মঘটে সাত দিন অচল থাকার পর চট্টগ্রাম বন্দরে শুরু হয়েছে অপারেশনাল কার্যক্রম। কনটেইনার ডেলিভারি বাড়ায় ইয়ার্ডে কমতে শুরু করেছে কনটেইনারের সংখ্যা। এদিকে বন্দর সচল হওয়ার পরদিন গতকাল মঙ্গলবার সকালে বন্দরে পোর্ট সিঙ্গেল উইন্ডো সিস্টেমের উদ্বোধন করা হয়েছে।
নতুন নোট বিক্রি করা বেআইনি
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দিতে সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিলসহ বিভিন্ন দাবিতে শ্রমিক-কর্মচারীদের ধর্মঘটে সাত দিন অচল ছিল চট্টগ্রাম বন্দর। গত ৩১ জানুয়ারি শুরু হয় এই ধর্মঘট। ৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি বাদ দিয়ে ধর্মঘট চলে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রমজানের ভোগ্যপণ্যের খালাসের বিষয় বিবেচনা করে সাত দিনের জন্য আন্দোলনকারীরা কর্মসূচি স্থগিত করলে গত সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে সচল হয় বন্দর।
বেড়েছে কনটেইনার ডেলিভারি
চট্টগ্রাম বন্দরে ধর্মঘটের কারণে কনটেইনারের সংখ্যা বেড়ে ৪০ হাজার টিইইউএস পার হয়ে যায়। গত ৮ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘটের কারণে ৯ ফেব্রুয়ারি বন্দরে কনটেইনার সংখ্যা দাঁড়ায় ৪২ হাজার ৭৫৭ টিইইউএসে। কিন্তু ৯ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে বন্দর সচল হওয়ায় কমতে শুরু করেছে কনটেইনারের সংখ্যা। বর্তমানে বন্দর ইয়ার্ডে ৪০ হাজার ১২৫ টিইইউএস কনটেইনার রয়েছে। এদিকে গত ৮ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘটের কারণে বন্দর থেকে একটি কনটেইনারও ডেলিভারি হয়নি। সচল হওয়ার পর গত ৯ ফেব্রুয়ারি ৫ হাজার ৫৩৯ টিইইউএস ও ১০ ফেব্রুয়ারি ৩ হাজার ৪২৮ টিইইউএস কনটেইনার ডেলিভারি হয়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, ‘বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গায় দিনের পর দিন ধর্মঘট কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়। সামনে নির্বাচন। এরপর নতুন সরকার আসবে। আমরা চাই সুন্দর একটি ব্যবসায় পরিবেশ। এতে করে আমাদের ব্যবসায়ী সমাজ ও দেশের অর্থনীতি গতিশীল হবে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণও বাড়বে।’
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, ‘ধর্মঘটের কারণে বন্দর, কাস্টমস অচল হয়ে যায়। রপ্তানিতে বড় অবদান রাখে পোশাক খাত। তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভোগ্যপণ্যে খালাস আটকে যায়। দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাই ধর্মঘট যাতে আর না হয় সেটাই আমরা চাই।’
বন্দরে পোর্ট সিঙ্গেল উইন্ডো সিস্টেমের উদ্বোধন
গতকাল সকালে চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের বোর্ডরুমে আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘পোর্ট সিঙ্গেল উইন্ডো’ নামক সিস্টেমের শুভ উদ্বোধন করা হয়েছে। এই কার্যক্রমের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর এখন থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ স্মার্ট পোর্ট এবং পেপারলেস ব্যবস্থাপনার দিকে যাত্রা শুরু করল বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
অনুষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান। এ সময় প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়) ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।
তিনি বলেন, এই সিস্টেম চালুর ফলে বন্দরের সামগ্রিক কার্যক্রমে ৩ থেকে ৫ গুণ গতি বৃদ্ধি পাবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।
পোর্ট সিঙ্গেল উইন্ডো সিস্টেমের মূল বৈশিষ্ট্য
ব্যবহারকারীরা একটি মাত্র লগইনের মাধ্যমে সব সেবা পাবেন এবং অটোমেটেড ভেসেল ট্র্যাকারের মাধ্যমে জাহাজের অবস্থান সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যাবে। আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের বিভিন্ন দপ্তরে না গিয়ে একটি প্ল্যাটফর্ম থেকেই সব অনুমোদন ও কার্গো ক্লিয়ারেন্স সম্পন্ন করার সুবিধা। এনবিআর, ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরকারি সংস্থার সঙ্গে সরাসরি ডাটা শেয়ারিং সুবিধা। প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে, যা ব্যবসা সহজীকরণে সহায়ক হবে।
সোমবার দিনে সচল বন্দর, রাতে আটক সমন্বয়ক
এদিকে গত সোমবার চট্টগ্রাম বন্দর সচল হয়। সোমবার সন্ধ্যায় বন্দর এলাকা থেকে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সমন্বয়ক ইব্রাহীম খোকন আটক করে র্যাব। চট্টগ্রাম বন্দরে গত ৩১ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া শ্রমিক-কর্মচারীদের ধর্মঘটে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন এই নেতা।
স্কপের প্রতিবাদ
এই নেতাকে আটকের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে চট্টগ্রাম শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে প্রতিবাদ জানান জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সভাপতি এ এম নাজিম উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার, শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য ও টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত, স্কপ চট্টগ্রাম জেলার সমন্বয়ক এস কে খোদা তোতন ও ইফতেখার কামাল খান, ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের সভাপতি খোরশেদুল আলম, বিএফটিইউসির সভাপতি কাজী আনোয়ারুল হক হুনি, বিএলএফের সভাপতি নুরুল আবসার তৌহিদ, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের নেতা হেলাল উদ্দিন কবির এবং বাংলাদেশ জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক জাহেদ উদ্দিন শাহিন।
নেতারা বলেন, প্রশাসন শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ পরিহার করে বারবার শ্রমিকদের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) বন্দরের পাঁচজন শ্রমিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, আর সোমবার ইব্রাহিম খোকনকে আটক করে প্রশাসন পরিকল্পিতভাবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার উসকানিতে লিপ্ত হয়েছে।
তারা আরও বলেন, রবিবার গভীর রাতে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট কর্মসূচি প্রত্যাহারের পর যখন বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক ও স্থিতিশীলভাবে চলছিল, ঠিক তখনই প্রশাসনের এমন রহস্যজনক ও নেতিবাচক পদক্ষেপ গভীর সন্দেহের জন্ম দেয়। এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে একটি মহল ইচ্ছাকৃতভাবে বন্দর পরিস্থিতি অশান্ত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।
স্কপ নেতারা অবিলম্বে ইব্রাহিম খোকনসহ গ্রেপ্তারকৃত সব শ্রমিক-নেতা-কর্মীর নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান। একই সঙ্গে আন্দোলনরত বন্দর শ্রমিকদের বিরুদ্ধে জারি করা হয়রানিমূলক সাময়িক বরখাস্ত ও দমনমূলক সব আদেশ প্রত্যাহারের জোর দাবি জানান তারা।
নেতারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, দমন-পীড়ন, গ্রেপ্তার ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলন দমন করা যাবে না। বন্দর ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সংগ্রামে শ্রমিকরা অতীতেও আপস করেননি, ভবিষ্যতেও করবেন না। প্রশাসন যদি এই উসকানিমূলক আচরণ থেকে সরে না আসে, তবে এর দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই বহন করতে হবে।


