৫০০-১০০০ টাকার নোট বাতিল হলে লাভ না ক্ষতি?

প্রতীকী ছবি
২৯ জুন ২০২৬, ০৬:৪৫ পিএম
বাংলাদেশে কি বাতিল হতে যাচ্ছে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট? জাতীয় সংসদে এমন একটি প্রস্তাব আসার পর থেকেই শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। কেউ বলছেন, এতে কালো টাকা বের হয়ে আসবে। আবার অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, এমন সিদ্ধান্ত বর্তমান অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাহলে প্রশ্ন হলো—সত্যিই যদি বড় মূল্যমানের নোট বাতিল করা হয়, তাহলে দেশের অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে?
প্রবাসী আয় প্রবাহে ঊর্ধ্বগতি
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে সরকারদলীয় এক সংসদ সদস্য ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের প্রস্তাব দেন। তার যুক্তি, ঘরে জমিয়ে রাখা অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসবে, কালো টাকার প্রবাহ কমবে এবং মানি লন্ডারিং নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে।
তবে অর্থনীতিবিদদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, বাস্তব চিত্র এতটা সহজ নয়।
তাদের মতে, দেশের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত বড় মূল্যমানের নোট দুটি একসঙ্গে বাতিল হলে প্রথম ধাক্কা লাগবে নগদ অর্থের সরবরাহে। কারণ বাংলাদেশে এখনো বিপুল পরিমাণ কেনাবেচা নগদ টাকায় হয়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল, কাঁচাবাজার, পরিবহন, কৃষিপণ্য ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোটই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।
হঠাৎ এসব নোট অচল হয়ে গেলে মানুষ দৈনন্দিন কেনাকাটায় সমস্যায় পড়তে পারে। পর্যাপ্ত ছোট নোট না থাকলে বাজারে লেনদেন কমে যাওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক কার্যক্রমও সাময়িকভাবে ধীর হয়ে যেতে পারে।
আরেকটি বড় চাপ পড়বে ব্যাংকিং খাতে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পুরোনো নোট জমা দিতে লাখ লাখ মানুষ ব্যাংকে ভিড় করলে ব্যাংকগুলোকে বাড়তি চাপ সামলাতে হবে। একই সঙ্গে পুরোনো নোট যাচাই, নতুন নোট সরবরাহ এবং নগদ ব্যবস্থাপনা পুরো প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি। কারণ এই খাতগুলো এখনো অনেকটাই নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল। নগদ সংকট দেখা দিলে ছোট দোকান, কৃষিপণ্য বিপণন, পরিবহন এবং দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থানে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহও আরও দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তাদের মতে, এমনিতেই অর্থনীতিতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে এসেছে। এর মধ্যে নগদ অর্থের সংকট তৈরি হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন করে চাপ তৈরি হবে।
কিছু মানুষের ধারণা, বড় নোট বাতিল করলে মূল্যস্ফীতি কমে যাবে। কিন্তু অনেক অর্থনীতিবিদ এই মতের সঙ্গে একমত নন। তাদের ভাষ্য, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির মূল কারণ অতিরিক্ত নগদ অর্থ নয়; বরং সরবরাহ সংকট, পরিবহন ব্যয়, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং বিভিন্ন কাঠামোগত সমস্যা। ফলে শুধু নোট বাতিল করলেই দ্রব্যমূল্য কমে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করছেন, এমন সিদ্ধান্ত মানুষের মধ্যে আতঙ্কও তৈরি করতে পারে। অনেকেই দ্রুত ব্যাংকে ছুটবেন, কেউ বিকল্প সম্পদ হিসেবে ডলার বা স্বর্ণ কেনার চেষ্টা করতে পারেন। এতে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারেও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই প্রসঙ্গে প্রায়ই ভারতের ২০১৬ সালের নোট বাতিলের উদাহরণ সামনে আসে। সে সময় দেশটির ৫০০ ও ১,০০০ রুপির নোট একদিনে বাতিল করা হয়েছিল। সরকারের লক্ষ্য ছিল কালো টাকা ও জাল নোট নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু পরে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাতিল হওয়া প্রায় সব নোটই আবার ব্যাংকে ফিরে আসে। ফলে কালো টাকা দমনের লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছিল, তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ব্যবসা ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছিল।
বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিলে ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে। কারণ এখনও অর্থনীতির বড় অংশ নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। এটি কেবল একজন সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত প্রস্তাব। অর্থাৎ আপাতত নোট বাতিলের কোনো সরকারি ঘোষণা নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, কালো টাকা, দুর্নীতি বা মানি লন্ডারিংয়ের মতো সমস্যার সমাধানে শুধু নোট বাতিলই যথেষ্ট নয়। বরং কর ব্যবস্থার সংস্কার, আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, কার্যকর নজরদারি এবং আইন প্রয়োগের মতো দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপই হতে পারে বেশি কার্যকর।


