গ্যাসের চুলোয় 'আমদানির' আগুন - ৩ সরকারের ঝুলিতে শুধু প্রতিশ্রুতির গ্যাস!

সরকার বদলায়, গ্যাসের চুলা নেভেই থাকে - মাস শেষে শুধু বিলের বোঝা!

মোঃ রিহাদ হোসেন

১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৫ পিএম

ক্ষমতার মসনদে পর পর তিন সরকার আসলেও বদলায়নি রান্নাঘরের বাস্তব চিত্র; বাপেক্সকে অবহেলা ও আমদানিনির্ভরতায় থমকে আছে অর্থনীতি, পিষ্ট সাধারণ মানুষ

সরকার পাল্টায়, ক্ষমতার রূপ বদলায়, কিন্তু সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের মিটমিটে বা নেভানো চুলার দৃশ্যটা যেন চিরন্তন।


দীর্ঘ দেড় দশকের আওয়ামী লীগ সরকারের অবসান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব পালন এবং পরবর্তীতে নব-নির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসা—৩ টি প্রশাসনিক ধাপ পার করলেও গৃহস্থালির গ্যাসের লাইনে সেই একই সমস্যা রয়ে গেছে। গ্রাহকদের পাইপলাইনে মোচর দিলে মেলা ‘হিস হিস’ শুকনো শব্দ, আর রান্নাঘরে জমা হয় কেবলই হতাশা।

তিন সরকারের আমলের চিত্র ও নীতি:

কর্মী নিয়োগে বাংলাদেশ-সৌদি আরব প্রথমবারের মতো চুক্তি স্বাক্ষর


আওয়ামী লীগ সরকার:

আওয়ামী লীগের আমলে দেশীয় গ্যাসের খনিগুলোতে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান ও উত্তোলনে অবহেলা করার অভিযোগ ওঠে। বাপেক্সকে (BAPEX) শক্তিশালী না করে গুরুত্ব দেওয়া হয় আমদানিকৃত এলএনজি (LNG) নির্ভরতায়, যা দেশীয় জ্বালানি খাতকে কোটি কোটি ডলারের বিদেশি সিন্ডিকেটের পকেটে ঠেলে দেয়।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার:

ক্ষমতা হস্তান্তরের পর সংস্কারের অনেক কথা বলা হলেও এলএনজি আমদানির বিশাল ব্যয় ও সংকট থেকে বেরিয়ে আসার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেখা যায়নি।

বর্তমান বিএনপি সরকার:

ক্ষমতার মসনদে আসীন হয়ে নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন ও আমদানির পথেই হাঁটছে সরকার। অনুসন্ধান ও ১৫০টি কূপ খননের আশ্বাস থাকলেও দিনশেষে বিপুল অর্থ খরচ করে বিদেশি আমদানিতেই ভরসা রাখা হচ্ছে।
দাম ও বিলের গ্যাঁড়াকল:

ক্ষমতা পরিবর্তনের সাথে সাথে ‘জনবান্ধব’ নীতির প্রতিশ্রুতি মেলা স্বাভাবিক ঘটনা হলেও মাস শেষে গ্যাসের বিলে কোনো ছাড় মেলেনি। আওয়ামী লীগ সরকার যে উচ্চহারের দর নির্ধারণ করে রেখে গিয়েছিল, তা অপরিবর্তিত রয়েছে। চুলায় পর্যাপ্ত গ্যাস জ্বলুক কিংবা খালি পাইপলাইন থাকুক, মাস শেষে শতভাগ বিল ঠিকই গুনতে হচ্ছে সাধারণ গ্রাহকদের।


অর্থনীতি ও জনগণের ওপর এর ভয়াবহ প্রভাব: ১। জাতীয় অর্থনীতিতে প্রভাব:বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ: দেশীয় গ্যাস না তুলে হাজার হাজার কোটি টাকার এলএনজি আমদানির কারণে দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার বাইরে চলে যাচ্ছে। এতে জাতীয় রিজার্ভের ওপর টান পড়ছে।
২। শিল্প উৎপাদনে ধস ও রফতানি হ্রাস: গ্যাস সংকটে মিল-কারখানাগুলোতে উৎপাদন ৪০% থেকে ৮০-৯০% পর্যন্ত ব্যাহত হচ্ছে। সময়মতো পণ্য তৈরি না হওয়ায় রফতানি বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে (GDP) বাধাগ্রস্ত করছবিদ্যুৎ সংকট ও অতিরিক্ত ভর্তুকি: গ্যাস দিয়ে পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো সচল রাখতে না পারায় লোডশেডিং বাড়ছে। বাধ্য হয়ে চড়া দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে গিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার সরকারি ভর্তুকির বোঝা বাড়ছে, যা শেষমেশ বাজেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
৩। জনগণের ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব: বাসাবাড়িতে পাইপলাইনের গ্যাস না থাকায় সাধারণ মানুষ সিলিন্ডার গ্যাস (LPG), ইলেকট্রিক চুলার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছেন। একদিকে পাইপলাইনের নির্দিষ্ট মাসিক বিল পরিশোধ, অন্যদিকে চড়া দামে এলপিজি কেনা—সব মিলিয়ে গ্রাহকের পকেট খালি হচ্ছে।
৪। দৈনন্দিন ভোগান্তি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি: সময়মতো রান্না না করতে পারা, কর্মজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের সময়সূচি ও খাওয়া-দাওয়ায় চরম ব্যাঘাত ঘটছে।
৫।যানবাহনে চরম ভোগান্তি: সিএনজি স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাস প্রেসার না থাকায় রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লম্বা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে যানবাহন। ফলে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সময় নষ্ট হচ্ছে এবং ভাড়া বৃদ্ধি পেয়ে সার্বিক জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছেক্ষমতায় বসার আগে সব রাজনৈতিক দলেরই বক্তব্য থাকে ‘স্বনির্ভর জ্বালানি খাত’ গড়ার। কিন্তু ক্ষমতার চেয়ারে বসলেই সবার ঝোঁক গিয়ে পড়ে এলএনজি আমদানির দিকে।

আগের সরকারের তৈরি করা এই আমদানিনির্ভরতার চক্র থেকে বর্তমান সরকারও বের হতে পারেনি। ফলে সরকারের ‘আমদানি প্রীতি’ সচল থাকলেও, অর্থনৈতিক স্থবিরতা আর নেভানো চুলার গ্যাঁড়াকলে পিষ্ট হয়ে আছে আমজনতা