মার্কিন পুঁজিতে বদলে যাচ্ছে বিশ্ব ফুটবল

ক্ষমতার নতুন কেন্দ্র

ছবি : সংগৃহীত

নিউজ ডেস্ক

০৮ জুন ২০২৬, ০২:৫১ পিএম

বিশ্ব ফুটবলের ক্ষমতার ভারসাম্যে নীরব কিন্তু গভীর পরিবর্তন ঘটছে। একসময় ইউরোপীয় ক্লাব, সমর্থক সংস্কৃতি এবং স্থানীয় ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ফুটবল এখন ক্রমেই মার্কিন পুঁজি, করপোরেট ব্যবস্থাপনা ও বিনোদননির্ভর ব্যবসায়িক মডেলের প্রভাবের অধীনে চলে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ফুটবল এখন শুধু একটি খেলা নয়; এটি দ্রুত রূপ নিচ্ছে বহুমাত্রিক বৈশ্বিক বিনোদন শিল্পে।


টেস্ট অধিনায়কত্ব ছাড়লেন শান্ত

ইউরোপীয় ফুটবলে মার্কিন আধিপত্য


গত এক দশকে ইউরোপের বিভিন্ন ফুটবল ক্লাবে মার্কিন বিনিয়োগ নজিরবিহীনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে ইউরোপজুড়ে প্রায় ১১৭টি ক্লাব সরাসরি বা পরোক্ষভাবে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে এ প্রবণতা সবচেয়ে স্পষ্ট। লিগটির অর্ধেকের বেশি ক্লাবের মালিকানা বা বড় অংশীদারিত্ব এখন মার্কিন ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগ তহবিলের হাতে। ইতালির সিরি আ, স্পেনের লা লিগা এবং ফ্রান্সের লিগ ওয়ানেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, আর্সেনাল, এসি মিলানসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ইতোমধ্যে মার্কিন পুঁজির প্রভাবের আওতায় এসেছে। ফলে ফুটবলের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে মার্কিন বিনিয়োগকারীরা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হচ্ছেন।

কেন ফুটবলে ঝুঁকছে মার্কিন পুঁজি?

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে ক্রীড়া ফ্র্যাঞ্চাইজির মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগকারীরা বিকল্প খুঁজছেন। সেই জায়গায় ইউরোপীয় ফুটবল ক্লাবগুলোকে তুলনামূলকভাবে কম মূল্যায়িত সম্পদ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কোভিড-১৯ মহামারির পর ইউরোপের অনেক ক্লাব আর্থিক সংকটে পড়ে। ম্যাচডে আয় কমে যাওয়ায় অনেক ক্লাব নতুন বিনিয়োগ গ্রহণে বাধ্য হয়। এই সুযোগেই মার্কিন বিনিয়োগকারীরা ইউরোপীয় ফুটবলে প্রবেশের পথ খুঁজে পায়।

এছাড়া ইউরোপের ফুটবল কাঠামোয় মালিকানা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম বিধিনিষেধ থাকাও বিদেশি পুঁজির প্রবেশকে সহজ করেছে।

বদলে যাচ্ছে ব্যবসায়িক মডেল

মার্কিন মালিকানার সবচেয়ে বড় প্রভাব দেখা যাচ্ছে ক্লাব পরিচালনার ধরনে। স্টেডিয়াম এখন আর শুধু খেলার মাঠ নয়; এটি পরিণত হচ্ছে বহুমুখী বাণিজ্যিক কেন্দ্রে।

করপোরেট বক্স, ভিআইপি সিট, কনসার্ট, আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান এবং স্পনসরশিপভিত্তিক আয় বৃদ্ধির দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে টেলিভিশন সম্প্রচার, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং বিজ্ঞাপনভিত্তিক রাজস্ব বাড়ানোর কৌশলও অনুসরণ করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় ফুটবলে ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের এনএফএল ও এনবিএ মডেলের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

বিশ্বকাপেও আমেরিকান ছোঁয়া

২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরেও দেখা যাচ্ছে নতুন বাস্তবতা। নিউজার্সিতে অনুষ্ঠেয় ফাইনালে ফুটবলের পাশাপাশি বিশাল বিনোদন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। হাফটাইম শো, সংগীত পরিবেশনা এবং বিনোদনমূলক আয়োজন যুক্ত হওয়ায় অনেকেই এটিকে সুপার বোল ধাঁচের আয়োজনের সঙ্গে তুলনা করছেন।

ফিফা একে বিশ্বব্যাপী উদযাপনের অংশ হিসেবে তুলে ধরলেও সমালোচকদের মতে, ফুটবল ধীরে ধীরে খেলার চেয়ে বিনোদননির্ভর পণ্যে পরিণত হচ্ছে।

বাড়ছে অর্থ, বাড়ছে উদ্বেগও

বিশ্ব ফুটবলে অর্থের প্রবাহ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। ফিফার পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বিশ্বকাপ চক্রে সংস্থাটির আয় ১৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে বিপুল অর্থ প্রবাহের মধ্যেও অনেক ক্লাব আর্থিক চাপে রয়েছে। ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলো রেকর্ড আয় করলেও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই লোকসানের মুখে পড়ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অর্থ ও ক্ষমতা যদি কয়েকটি বড় ক্লাবের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পরিচয় সংকটের মুখে ফুটবল?

ইউরোপের অনেক সমর্থক মনে করেন, ফুটবল তার ঐতিহ্যগত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চরিত্র হারাতে শুরু করেছে। টিকিটের মূল্য বৃদ্ধি, করপোরেট মালিকানার বিস্তার এবং মুনাফাকেন্দ্রিক পরিচালনা দর্শকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

একাধিক গবেষণা বলছে, ব্যবসায়িক দক্ষতা বাড়লেও ক্লাব ও সমর্থকদের ঐতিহাসিক সম্পর্ক দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

নতুন যুগের শুরু?

বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন বিনিয়োগ বিশ্ব ফুটবলকে নতুন অর্থনৈতিক উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তি, বিপণন, সম্প্রচার ও বিনোদনের সমন্বয়ে ফুটবল আরও বৈশ্বিক হয়ে উঠছে। তবে একই সঙ্গে প্রশ্নও উঠছে— এই পরিবর্তন কি ফুটবলকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করবে, নাকি ধীরে ধীরে এটিকে অতিরিক্ত বাণিজ্যিক একটি বিনোদন শিল্পে পরিণত করবে?

বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে সেই প্রশ্নের উত্তরের ওপর।

বিশ্ব ফুটবল
ইউরোপীয় ফুটবল
মার্কিন বিনিয়োগ
প্রিমিয়ার লিগ
ফুটবল মালিকানা