মিত্র সংকটে বিএনপি!

ছবি : সংগৃহীত
০২ নভেম্বর ২০২৫, ০৫:০৯ পিএম
দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ছায়া ও ব্যানারে দীর্ঘদিন প্রতিপালিত হলেও বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীসহ ডানপন্থী ও ইসলামি কয়েকটি ছোট দল ভিন্ন পথে এগিয়ে যাচ্ছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে থেকে সরকারি সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগকারীরা এখন দেশ ও বিদেশে ভিন্ন বুলিতে প্রচার চালাচ্ছে।
ক্রয় পদ্ধতিতে হবে গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের কাজ
নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের বাইরে গিয়ে একক রাজনীতি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কয়েকটি ডানপন্থী ছোট দল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দলের প্রকাশ্যে রাজনীতি করার নিষেধাজ্ঞা একসময় স্থগিত করা হয়। প্রকাশ্যে রাজনীতির সুযোগ দিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তাঁর পথ অনুসরণ করেন বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
সব প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশসহ ডানপন্থী ছোট কয়েকটি রাজনৈতিক দলকে আগলে রাখেন। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত প্রায় ৫ বছর, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত ৫ বছর এবং ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত আরও ৫ বছর—অর্থাৎ প্রায় ১৫ বছর বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এবং বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকারে থেকে এই দলগুলো বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছে। কিন্তু বর্তমানে তারা স্বাধীন দল হিসেবে পৃথকভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও তৎপরতা চালাচ্ছে।
বিএনপি দেশের সর্বত্র এবং বিদেশে ছড়িয়ে থাকা বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মী ও জনসমর্থনপুষ্ট একটি জনপ্রিয় দল। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি বিশ্বাস করে—‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়।’ এই মূলনীতিতেই বিএনপি আজও রাজনীতির মহাসাগরে শক্তিশালী ও জননন্দিত একটি রাজনৈতিক শক্তি।
জিয়াউর রহমান : এক সাহসী নেতৃত্বের প্রতীক
বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণায় থেমে থাকেননি। জেড ফোর্সের কমান্ডিং অফিসার হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন, যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। আধুনিক অস্ত্রে সুসজ্জিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তিনি নিজ জীবন ও পরিবারকে বিপন্ন করে তুলেছিলেন।
সেনাবাহিনিতে বিদ্রোহী চৌকস কর্মকর্তা হিসেবে তিনি “বীর উত্তম” খেতাব অর্জন করেন। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তিনি অল্প সময়েই বাংলাদেশকে ঘুরে দাঁড় করান। তাঁর সময়ে খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের উৎপাদন তিন থেকে চার গুণ বৃদ্ধি পায়।
তিনি জাতীয় উন্নয়নে নানা প্রকল্প গ্রহণ করেন, খাল খননের মাধ্যমে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেন এবং জাতির সামনে উপস্থাপন করেন ১৯ দফা কর্মসূচি। প্রকাশ করেন “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ”-এর ধারা ও মূল্যবোধ।
কোটা আন্দোলন ও রাজনীতির নতুন ধারা
২০১২ সালে সরকারি চাকরিতে ৫৬% কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হলেও, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের কঠোর অবস্থান ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় আন্দোলনকারীরা পিছু হটে। ২০১৮ সালে পুনরায় এই আন্দোলন দানা বাঁধে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তখন কোটা সংস্কার আন্দোলনের ন্যায্যতার পক্ষে অবস্থান নেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষকের সঙ্গে তাঁর টেলিফোন সংলাপের পর প্রথমবারের মতো শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার চাপে পড়ে। পরবর্তীতে সরকার ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণির চাকরিতে কোটা স্থগিতের প্রজ্ঞাপন জারি করে।
তবে মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের একটি অংশ সরকারি সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করে। ২০২৪ সালে আদালত সরকারি সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করলে শিক্ষার্থীরা পুনরায় মাঠে নামে। আন্দোলন দমনে সরকার কঠোর অবস্থান নেয়; ছাত্র, যুব ও সন্ত্রাসী হামলায় নারী শিক্ষার্থীরাও নিগৃহীত হয়।
এই আন্দোলনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষ অংশ নেয়। অবশেষে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটে।
বিএনপির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ
সরকার পতনের পর প্রতিপক্ষবিহীন রাজনীতিতে নানা নামের ছোট দলগুলো নিজেদের সরকার গঠনের রঙিন স্বপ্নে বিভোর। বিএনপির দীর্ঘদিনের মিত্ররাও এখন দূরত্ব বজায় রাখছে। তবু দেশের মানুষের মধ্যে আজও বিএনপির প্রতি আস্থা অটুট।
২০০৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৮ বছর বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হওয়ায় সাধারণ মানুষের ভোটের আগ্রহ হারিয়ে গিয়েছিল। এখন শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর সবাই আশা করছে— একটি শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
বাংলাদেশের মানুষ আজ স্বপ্ন দেখে— একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, যেখানে সকল দল অংশগ্রহণ করবে; যেখানে জনগণের ভোটেই নির্ধারিত হবে দেশের ভবিষ্যৎ সরকার।
বাংলাদেশের রাজনীতি আজ নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে। বিএনপি তার মিত্র সংকট কাটিয়ে আবারও বৃহৎ জাতীয় শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে— এমন প্রত্যাশাই করছে দেশের সাধারণ মানুষ।


