তারেক রহমানকে হত্যার পরিকল্পনা!

ভারতীয় মিডিয়ায় প্রশ্নবিদ্ধ এরদোয়ান

ছবি : সংগৃহীত

এসএম ফজলুল হক (বিশেষ প্রতিবেদক)

০৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৫:০২ পিএম

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য হত্যাচক্রান্তের বিষয়ে ভারতের কয়েকটি গণমাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত সংবাদ বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। এসব প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান নাকি তুর্কি গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে তারেক রহমানকে ‘বাংলাদেশে ফেরার পর টার্গেট করার’ পরিকল্পনায় থাকতে পারেন। তবে এই দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো আন্তর্জাতিকভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তুরস্ক এবং বিএনপি—দুই পক্ষই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। ফলে বিষয়টি কতটা তথ্যভিত্তিক, আর কতটা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটনির্ভর—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।


জিয়াউর রহমানের জন্মদিন আজ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমানের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত। ২০০৮ সালে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পর তিনি আর দেশে ফেরেননি। বিভিন্ন মামলায় তাকে দণ্ডিত করা হয়, যেগুলো বিএনপি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ঘিরেও। বিএনপির মতে, ২০০৬ থেকে ২০২৫ সময়কালে জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা, দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক চাপের ঘটনাগুলোই দেশের রাজনৈতিক উত্তাপ স্থায়ী করে রেখেছে।


এরই মধ্যে ভারতের কয়েকটি অনলাইন গণমাধ্যমে দাবি করা হয় যে, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রেক্ষাপটে তুরস্ক বিএনপিবিরোধী কিছু রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সমন্বয় করছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে একে পার্টির অতীত সম্পর্কের প্রসঙ্গও উত্থাপিত হয়েছে। কিন্তু তুরস্কের পক্ষ থেকে বা কোনো স্বীকৃত গোয়েন্দা বা নিরাপত্তা সংস্থার সূত্র থেকে এ ধরনের তথ্য নিশ্চিত করা হয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশে বাংলাদেশ ইস্যু প্রায়ই সংবেদনশীলভাবে ব্যবহৃত হয়, ফলে সংবাদের উৎস ও উদ্দেশ্য আরও পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই জরুরি।

অন্যদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বেশ পরিবর্তিত হয়েছে। ৫৬% কোটা সংস্কার আন্দোলনসহ বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক অস্থিরতার পর শেখ হাসিনার সরকার পদত্যাগ করে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়েছে। নতুন সরকার ভোটাধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিলে রাজনৈতিক মাঠে সক্রিয়তা বাড়ে এবং বিভিন্ন দল নির্বাচনের প্রস্তুতিতে নামে।

জনমত যাচাই সংক্রান্ত একাধিক জরিপে বিএনপিকে এগিয়ে দেখানো হলে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও তীব্র হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর মধ্যে প্রতিযোগিতা, অভিযোগ–প্রতিআরোপ এবং বিদেশি সম্পৃক্ততার গুঞ্জন বাড়ে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থে ভুল তথ্য, গুজব বা অপপ্রচার ছড়ানোর আশঙ্কা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। তারেক রহমানকে নিয়ে সাম্প্রতিক বিদেশি মিডিয়ার দাবি সেই প্রবণতারই অংশ হতে পারে বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক।

তবে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মতে, তারেক রহমানকে নিয়ে দেশি-বিদেশি নানা ধরনের আলোচনা হওয়াটা নতুন নয়। দলটি মনে করে, নির্বাচন ঘিরে তাকে কেন্দ্র করে অনিশ্চয়তা তৈরি করা বা বিভ্রান্তি ছড়ানো রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হতে পারে। তারা আরও বলছেন, বিরোধী নেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং এ ধরনের খবর নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।

এদিকে তুরস্ক ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে স্থিতিশীল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জামায়াতে ইসলামের অতীত ভূমিকা নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও তুরস্কের সঙ্গে এ সম্পর্কের চিত্র কতোটা রাজনৈতিকভাবে প্রভাব ফেলতে পারে—তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তুরস্কের সরকারি অবস্থান স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত ভারতের গণমাধ্যমের দাবিকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়। ফলে প্রধান প্রশ্নটি এখনো অনির্দিষ্ট—তারেক রহমানকে লক্ষ্য করে কোনো আন্তর্জাতিক পরিকল্পনা কি সত্যিই আছে, নাকি এটি তথ্যযুদ্ধ ও রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যকার একটি বিতর্ক মাত্র? সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সূত্র ছাড়া বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।