মুক্তিযোদ্ধার দৌহিত্র
ছোটগল্প
.png)
এআই দিয়ে বানানো কল্পিত দৃশ্য
১০ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৯:৩৪ পিএম
বসন্তের শেষ বিকেল। নদীর ধারে একা বসে আছে মানিক। চোখ জলে ভেজা, মুখে ক্লান্তির ছাপ। নদীর ধীর স্রোতের দিকে তাকিয়ে তার মনে ভেসে উঠছে দাদার মুখ, হারানো দিনের স্মৃতি।
ঐতিহাসিক পলাশী দিবস আজ
মানিকের বয়স কেবল কুড়ির কাছাকাছি। সরু-পাতলা গড়ন, শ্যামল মুখ। অথচ এই অল্প বয়সে সে বয়ে চলেছে গভীর শোক। গতকাল তার দাদা মারা গেছেন। সেই শূন্যতা এখনো তার বুক চেপে ধরে আছে।
তার দাদা মৌলানা বশির আহমদ ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। শুধু মুক্তিযোদ্ধাই নন, ১৯৭১ সালে ছিলেন এক সেক্টরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমান্ডার। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা দেখে ঘরে বসে থাকতে পারেননি তিনি। তখন তিনি ছিলেন তরুণ— চোখে দুর্নিবার আগুন, হৃদয়ে স্বাধীনতার শপথ। মায়ের একটি কথা তার জীবনদর্শন হয়ে উঠেছিল— “জীবনবাজি রেখে হলেও জালেমের বিরুদ্ধে দাঁড়াবি।”
সেই কথাই তাকে নির্ভীক করেছিল। তিনি গড়ে তুলেছিলেন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল। একের পর এক গেরিলা আক্রমণে ধ্বংস করেছিলেন হানাদারদের ঘাঁটি। এলাকাবাসীর কাছে হয়ে উঠেছিলেন শ্রদ্ধার পাত্র, সাহসের প্রতীক। কিন্তু শত্রু শুধু সম্মুখযুদ্ধেই ছিল না— ছিল ঘরের ভেতরেও। তার চাচাতো ভাই ফিরোজ খান। কলেজ পাশ করার পরই সে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী হয়ে ওঠে। দাড়ি-টুপি পরে কৌশলে মুক্তিবাহিনীতে ঢুকে পড়ে এবং গোপনে সব তথ্য পাঠাতে থাকে হানাদারদের কাছে। ফলে একের পর এক অপারেশন ব্যর্থ হয়, শহিদ হন অনেক মুক্তিযোদ্ধাও।
দেরিতে হলেও মৌলানা বশির সত্যটি বুঝতে পারেন। ততদিনে ফিরোজ পাকিস্তানিদের বিশেষ আস্থাভাজন। এক রাতে তাকে ধরে নিয়ে নির্মম নির্যাতন করা হয়। মৃত ভেবে ফেলে রেখে যায় পাকিস্তানিরা। সেই রাতেই তাদের গ্রাম পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। কিন্তু অলৌকিকভাবে বেঁচে যান মৌলানা বশির।
এরপর দেশ স্বাধীন হয়। স্বাধীনতার পর সত্যের মূল্য আর আগের মতো থাকে না। বিশৃঙ্খলা ও স্বার্থান্বেষীদের দাপটে অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার নাম বাদ পড়ে যায়। আবার বহু রাজাকারের ভাগ্যে জোটে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সনদ। ফিরোজ হয়ে ওঠে প্রভাবশালী সমাজসেবক। সংসদ সদস্য হওয়ার স্বপ্নও প্রায় সুনিশ্চিত।
আর মৌলানা বশির? তাকে ডাকা হয়— “মোল্লা”, “মৌলবাদী”, এমনকি “যুদ্ধাপরাধী”— মিথ্যে অভিযোগের ভারে তাকে নুইয়ে দেওয়া হয়।
একদিন পথে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি হঠাৎ পড়ে যান ফিরোজের গাড়ির সামনে। বশিরকে দেখেই ফিরোজ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। অতীত ফিরে আসার ভয়ে সেই রাতে আর ঘুমাতে পারে না। পরদিন ভোরে সে ওত পেতে দাঁড়ায় বশিরের মাদ্রাসার সামনে। ফজরের নামাজ শেষে বের হতেই মৌলানা বশির তাকে দেখে চিৎকার করে ওঠেন— “এই সেই রাজাকার!” ঠিক সেই মুহূর্তে সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন সাংবাদিক খালেদ হায়দার। ঘটনা বুঝে ছবি তুলতেই মুহূর্তের মধ্যে ফিরোজ রিভলভার বের করে গুলি চালায়। গুলি লাগে মৌলানা বশিরের বুকে। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। লোকজন ছুটে এলে ফিরোজকে তার সহযোগীরা তুলে নিয়ে পালিয়ে যায়।
দেশ কেঁপে ওঠে, অধিকাংশ পত্রিকার শিরোনাম হয়— “মাদ্রাসার হুজুর খুন”, “মৌলবাদীর মৃত্যু”। শুধু একটি দৈনিক ভিন্ন শিরোনাম করে— “সমাজসেবীর গুলিতে নিহত আলেম মুক্তিযোদ্ধা।” এতেই শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। সাংবাদিকরা ছুটে যান মানিকদের বাড়িতে। মানিকের মা সত্য গোপন রাখতে অনুরোধ করেন। কিন্তু মানিক চুপ থাকে না। নির্ভয়ে সে সব বলে দেয়। সাক্ষ্যপ্রমাণে দোষী সাব্যস্ত হয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় ফিরোজের। তবু মানিক ভয় পায় না। সত্যের শক্তি সম্পর্কে সে জেনেছে দাদার কাছ থেকেই।
পরদিন সকালে তাকে দেখা যায় মাদ্রাসার পথে হাঁটতে। চোখে অশ্রু, অথচ মন অটল ও দৃঢ। তার ভবিষ্যৎ কোন্ পথে যাবে— তা কেউ জানে না। তবে একটি বিশ্বাস সবার হৃদয়ে দৃঢ় হয়ে গেছে— একজন আলেম মুক্তিযোদ্ধার দৌহিত্র কখনোই নিজের দেশের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না।
গল্পকার : সহ-প্রচার সম্পাদক, জাতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।


