রাস্তা সংস্কারের নামে হরিলুট, অভিযোগের তীর প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে

ছবি : আওয়ার বাংলাদেশ
১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৯:০৭ পিএম
ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল থানার অন্তর্গত চেলের ঘাট, মাগুর জোরা, চান্দের টেকি হয়ে কানার ঘাটের রাস্তা মেরামতে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এলাকাবাসীর দুর্ভোগ কমানোর লক্ষ্যে এলজিইডি সরকারি বাজেটে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে আগের ঠিকাদার পরিবর্তন করে নতুন করে রাস্তার মেরামতের কাজ দেয়। রাস্তা মেরামতে অনিয়ম-দুর্নীতি প্রকাশ পেলে এলাকাবাসী গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে অভিযোগ করেন। অভিযোগ যাচাইয়ে এই প্রতিবেদক টিম সরেজমিনে গিয়ে বিষয়টির সত্যতা দেখতে পায়।
জাতীয় নির্বাচন বিষয়ে কোনো নির্দেশনা পায়নি সেনা সদর
এ বিষয়ে ত্রিশাল উপজেলার প্রধান প্রকৌশলী যুবায়েত হোসেনের সাথে প্রতিবেদক টিম কথা বলেন। কাজের ওয়ার্কঅর্ডার সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে সহযোগিতা করতে বললে তিনি বেঁকে বসেন এবং অসৌজন্যমূলক আচরণ শুরু করেন। অনুসন্ধানী টিম বারবার কাজের ওয়ার্কঅর্ডারের তথ্য সংগ্রহ করে সহযোগিতা চাইলে উপজেলা প্রকৌশলী ২০০৯ তথ্য অধিকার সংরক্ষণ আইনের একটি মেইলের ঠিকানা হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারে দিয়ে বলেন, ‘সরকারি ফি প্রদান করে তারপর তথ্য সংগ্রহ করে নিতে হবে।’ তার পরিপ্রেক্ষিতে আবেদনকারী সংবাদকর্মী ২০০৯ এর তথ্য অধিকার সংরক্ষণ আইনের মাধ্যমে ১৬০ টাকা পরিশোধ করে টাকা জমা দেওয়ার রশিদ ও অন্যান্য সকল ডকুমেন্টস নিয়ে অফিসে গিয়ে কথা বলার পরে ও গড়িমসি করেন ওয়ার্কঅর্ডারের তথ্যসংবলিত কাগজপত্র প্রদান করতে।
গত ১৩ জানুয়ারি সরকারি বিধি মোতাবেক তথ্য অধিকার সংরক্ষণ আইনে আবেদন করে সঠিক দিকনির্দেশনা ও সহযোগিতা না করার ফলে গত ২৭ জানুয়ারি প্রতিবেদক আবারও উপজেলা প্রকৌশলীর সঙ্গে দেখা করে ওয়ার্কঅর্ডার সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্তৃপক্ষকে না পেয়ে দুপুর ১২:০১ মিনিটে উপজেলা প্রকৌশলী যুবায়েত হোসেনকে কল করলে তিনি বাইরে আছেন বলে এই প্রতিবেদককে জানান, ‘আমি সাইটের কাজ শেষ করে আসতেছি। আপনারা অফিসে অপেক্ষা করেন।’ কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পরেও তিনি আর প্রতিবেদকের সাথে কোনোরূপ যোগাযোগ করেননি। এমনকি কাজের ওয়ার্কঅর্ডার সংক্রান্ত তথ্য দিয়ে সহযোগিতা না করে ছলনার আশ্রয় নেন।
ভিন্ন কৌশলের আশ্রয় হিসেবে এই প্রতিবেদক তার গণমাধ্যম টিমকে আবারও ওয়ার্কঅর্ডার সংক্রান্ত তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করতে অফিসে পাঠালে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে চিনতে পেরে তিনি তড়িঘড়ি করে অতি দ্রুত অফিসের গাড়ি না নিয়ে একটি সিএনজিযোগে অফিস ত্যাগ করে চলে যান। অথচ চলমান কাজের সাইট ম্যানেজার ও এলাকাবাসীর কথায় জানা যায়, কাজ শুরু করা থেকে আজ অবধি কোনোদিন কোনো ইঞ্জিনিয়ার বা সরকারি কোনো কর্মকর্তা সাইটের কাজ পরিদর্শন করতে আসেননি। এমনকি অফিসে গিয়ে কাজের ওয়ার্কঅর্ডার সংক্রান্ত তথ্য চাইলে প্রকৌশলী যুবায়েত ছাড়া কেউ দিতে পারবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবেদক লাইসেন্স স্বত্ত্বাধিকারীর নাম, কত টাকার কাজ, কত ফিট রাস্তা ও কী ধরনের ম্যাটেরিয়াল এই রাস্তা মেরামতের জন্য সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তা জানতে পারেনি।
তবে এলাকাবাসীর বক্তব্য থেকে জানা যায়, আনুমানিক ২-৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও তিন কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে রাস্তাটি মেরামতের জন্য। এলাকাবাসী অনেকবার মৌখিক অভিযোগ দেওয়ার পরেও কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কারোর অভিযোগের বিষয়ে কর্ণপাত করেনি। তবে গত ৮ ফেব্রুয়ারি আবেদন করার ২৬দিন পর মিলেছে তথ্য সংবলিত কাগজ। সেখানে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এমআরআরআইডিপি (MRRIDP) প্রকল্পের অধীনে এই ২.৮ কিলোমিটার রাস্তা উন্নয়নের বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়। কেবল পেভমেন্ট ও সারফেসিং কাজের জন্যই বরাদ্দ ছিল ৩ কোটি ১৬ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ, যা কাজ হয়েছে তাও অত্যন্ত নিম্নমানের। বালুর বদলে সরাসরি মাটি এবং নিম্নমানের ২ ও ৩ নম্বর’ ইটের খোয়া দিয়ে দায়সারাভাবে কাজ শেষ করার পাঁয়তারা চলছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপজেলা প্রকৌশলী যুবায়েত হোসেন, সহকারী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে চলছে এই প্রকাশ্য ‘হরিলুট’। নথিতে সহকারী, উপ-সহকারী ও উপজেলা প্রকৌশলীর সিল-স্বাক্ষর থাকলেও মাঠপর্যায়ে কোন তদারকি নেই।
প্রকল্পের নথিতে সুরক্ষা কাজের জন্য ২২ লক্ষ এবং সড়ক নিরাপত্তার জন্য ৮ লক্ষ টাকা বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে কোনো নিরাপত্তা চিহ্ন বা মজবুত গাইডওয়ালের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিস্ময়কর তথ্য হলো, উপজেলা প্রকৌশলী যুবায়েত হোসেন জনৈক ‘আলম’ নামক এক ব্যক্তির ঠিকাদারির কথা বললেও কাগজ-কলমে সেই নামের কোনো অস্তিত্বই নেই। এই ‘বেনামি’ ঠিকাদারের খুঁটির জোর কোথায়, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, ২০২৬ সাল পর্যন্ত কেন এই জনগুরুত্বপূর্ণ রাস্তাটি অসম্পূর্ণ হয়ে পড়ে রইলো? কেন ৩ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা ব্যয়ের পরও দুর্ভোগ কমলো না এলাকাবাসীর?
এলাকাবাসী এই প্রতিবেদককে জানান, এই রাস্তা প্রায় ২ বছরের বেশি সময় ধরে খুবই খারাপ অবস্থায় ছিল। রাস্তায় খানাখন্দ থাকার ফলে এলাকাবাসীর চলাচলে চরম দুর্ভোগ ছিল। ভারী পণ্য পরিবহনে বিকল্প রাস্তা ব্যবহার করতে গিয়ে তাদের অনেক কষ্ট ও আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। যেহেতু এলাকায় অনেক পাঙ্গাস মাছের খামার রয়েছে তাই মাছ পরিবহনে বিকল্প রাস্তা ব্যবহারের কারণে একদিকে ছিল অবর্ণনীয় কষ্ট, সেই সাথে পরিবহন খরচ বেড়ে গিয়ে মাছ ব্যবসায় অনেক লোকসান গুণতে হয়েছে।
সরকার পতনের পর এলাকাবাসী আশা করেছিলেন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অতি দ্রুত তাদের চলাচলের একমাত্র এই রাস্তা নিয়ে যে অবর্ণনীয় কষ্ট তারা করেছেন তার একটা সুফল পেতে যাচ্ছেন। কিন্তু তারা অতি দুঃখের সাথে জানিয়েছেন, এতো নিম্নমানের ম্যাটারিয়ালের কাজ কোনো রাস্তায় আজ পর্যন্ত তারা দেখেননি। পুরো রাস্তায় এক গাড়ি নতুন বালিও দেওয়া হয়নি। বরং আগের রাস্তার পুরনো মাটি ও ইটের খোয়ার সংমিশ্রণের মাটি দিয়ে ও খুবই নিম্নমানের ইটের খোয়া ব্যবহার করে রাস্তার কাজ তড়িঘড়ি সমাপ্ত করার পাঁয়তারা চলছে। যার সকল ভিডিও ফুটেজ, ছবি ও এলাকাবাসীর বক্তব্য এই প্রতিবেদকের কাছে রেকর্ড করা আছে।
এই কাজের দায়িত্বে সাইট ম্যানেজার হানিফের সাথে কথা বললে তিনি গণমাধ্যম কর্মীদের এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ‘এক নাম্বার ইটের খোয়া দিয়ে কাজ চলছে’ দাবি করলেও বাস্তবে তিনি তার কথার স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি। বরং ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়ে তিনি এলাকাবাসীকে বোঝাতে চেষ্টা করছেন যে, ‘গণমাধ্যমকর্মী রাস্তা মেরামতের সংবাদ প্রকাশ করলে এ রাস্তার কাজ বন্ধ হয়ে যাবে। তখন আবারও আপনাদের ভাঙা রাস্তায় চলাচল করতে দুর্ভোগ পোহাতে হবে।’
রাস্তা মেরামতের কাজের অনিয়মের কারণে এলাকাবাসী প্রথম থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভ সম্প্রচার করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু উল্টো এই কাজের মেরামতের অনিয়মের জন্য বাধা দেওয়ায় একজন মালবাহী ভ্যানচালক তার বক্তব্যে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে জানান, ‘একটি দলীয় মিটিংয়ে আল আমিন নামের এক যুবককে নির্বাচনের পরে দেখে নিবেন বলে হুমকি দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট রাস্তা মেরামতের কাজ পাওয়া বর্তমান ঠিকাদার আলম সাহেব।’
সম্প্রতি এলাকাবাসী সংশ্লিষ্ট কাজের ঠিকাদারকে আটক করে রাস্তার কাজ বন্ধ রাখতে বললে খবর পেয়েই প্রধান প্রকৌশলী তার সহকারী প্রকৌশলীদের নিয়ে রাতের আঁধারে তড়িঘড়ি করে কাজের সাইটে আসেন। এ সময় তাদেরকেও এলাকাবাসীর তোপের মুখে পড়তে হয়। এতে সকলের সামনে রাস্তার মেরামত কাজের অনিয়ম-দুর্নীতি প্রমাণিত হয়ে যায়।
এলাকাবাসী অনুসন্ধানী টিমকে বলেন, সরকারি টাকা অপচয় করে এমন মানহীন রাস্তা মেরামত তারা চান না। রাস্তাটি একজন সরকারি দায়িত্বশীল ইঞ্জিনিয়ারের তত্ত্বাবধানে টেকসই ও মজবুতভাবে মেরামতের জন্য দেওয়া হোক। সেই সাথে সংশ্লিষ্ট কাজে যারা দুর্নীতিতে যুক্ত তাদেরকে শীঘ্রই আইনের আওতায় নিয়ে উপযুক্ত শাস্তির দাবি করেন তারা।
সার্বিক বিষয়ে দৃষ্টিআকর্ষণ করলে ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরাফাত সিদ্দিকী দৈনিক আওয়ার বাংলাদেশকে বলেন, ‘অভিযোগ সম্পর্কে জেনেছি। ভিডিও ফুটেজগুলো পর্যালোচনা করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


