মাজারের ডেগে হাত, কপাল পুড়ল ডিসি সারওয়ারের

ছবি : সংগৃহীত

নিউজ ডেস্ক

২১ জুন ২০২৬, ০৬:৫৫ পিএম

হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে দানের অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়ার মাত্র তিন দিনের মাথায় প্রত্যাহার করা হয়েছে সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) সারওয়ার আলমকে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে।


ঢাকায় বন্ধ ভারতীয় ভিসা সেন্টার

রবিবার (২১ জুন) জারি করা প্রজ্ঞাপনে প্রত্যাহারের কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তবে মাজারের দানের ডেগ সিলগালা, নতুন দানবাক্স স্থাপন এবং তহবিল ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক ও সমালোচনা তৈরি হয়েছিল, সেটিই তার প্রত্যাহারের পেছনে প্রধান কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


গত ১৮ জুন বিকেলে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহে থাকা ঐতিহাসিক তিনটি দানের ডেগ সিলগালা করে জেলা প্রশাসন। একই সঙ্গে প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয় এবং নিরাপত্তার জন্য আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়।

এর আগে মাজার পরিদর্শনে গিয়ে জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম দানের অর্থের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার ঘোষণা দেন। তার ভাষ্য ছিল, মাজারে জমা হওয়া অর্থ জনসাধারণের দান এবং এর আয়-ব্যয়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তিনি দাবি করেছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে দানের অর্থ বণ্টন ও ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম চলে আসছে। তাই নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে সব দান প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে এনে মাজার, মসজিদ ও মাদ্রাসার উন্নয়নে ব্যয় করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

জেলা প্রশাসনের এই পদক্ষেপের পরপরই মাজার প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ শুরু হয়। মাজারের খাদেম, আশেকান ও ভক্তদের একটি অংশ অভিযোগ করেন, শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যে প্রশাসন অযাচিত হস্তক্ষেপ করছে।

তাদের মতে, দানের অর্থের হিসাব-নিকাশের প্রয়োজন থাকলেও ঐতিহ্যগত ব্যবস্থাপনা ভেঙে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।

দরগাহের অন্যতম খাদেম মুফতি রায়হান উদ্দিন বলেন, দানের অর্থের হিসাব চাইতে পারে যে কেউ, কিন্তু যেভাবে ডেগ সিলগালা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে, তা সঠিক পদ্ধতি নয়। এতে মাজারকেন্দ্রিক মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজারে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ দান আসে। নগদ অর্থ ছাড়াও সোনা, গবাদিপশু ও বিভিন্ন সামগ্রী দান করেন ভক্তরা।

কিন্তু এই বিপুল অর্থ কোথায় ব্যয় হয় এবং এর হিসাব কতটা স্বচ্ছ—তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন ছিল। সম্প্রতি একটি সরকারি প্রকল্পের কাজ চলাকালে মাজারের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

জেলা প্রশাসনের দাবি, হিসাব চাওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় তথ্য উপস্থাপন করতে পারেনি। এরপরই প্রশাসন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

সারওয়ার আলমের প্রত্যাহারের খবরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের মতে, দানের অর্থের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গিয়ে তিনি প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠীর বিরোধিতার মুখে পড়েছেন।

আবার অন্য একটি পক্ষের মতে, মাজারের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপই পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।

জাতীয় ইমাম সমিতি সিলেট জেলা শাখার সভাপতি মাওলানা এহসান উদ্দিন বলেন, মাজারের দানের অর্থে স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগই জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়ার অন্যতম কারণ।

উল্লেখ্য, ২৭তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা সারওয়ার আলম র‍্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিতি পান। ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে তিনি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছিলেন।

সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সাদাপাথর এলাকায় অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধসহ বিভিন্ন উদ্যোগের জন্যও আলোচনায় আসেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত মাজারের দান ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের উদ্যোগই তাকে সবচেয়ে বড় বিতর্কের মুখে ফেলে।

এখন প্রশ্ন উঠেছে—দানের অর্থের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ কি প্রশাসনিক সংস্কারের অংশ ছিল, নাকি এটি ছিল একটি স্পর্শকাতর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ? সেই বিতর্কের মধ্যেই সিলেট ছাড়তে হলো আলোচিত এই জেলা প্রশাসককে।