বাংলাদেশে কেন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে এত মাতামাতি

বিশ্বমঞ্চে উঠে এলো ফুটবল প্রেমের গল্প

ছবি : সংগৃহীত

নিউজ ডেস্ক

২৮ জুন ২০২৬, ০৪:১১ পিএম

বিশ্বকাপ এলেই যেন বদলে যায় বাংলাদেশের চিত্র। দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত—কোথাও উড়ছে আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা পতাকা, কোথাও আবার ব্রাজিলের সবুজ-হলুদ। কিন্তু হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দুটি দেশের প্রতি বাংলাদেশিদের এই গভীর ভালোবাসার শুরু কোথায়? আর কেনই-বা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে আছে এই আবেগ?


১২ বল হাতে রেখেই বাংলাদেশের জয়

বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যম *দ্য গার্ডিয়ান* প্রকাশ করেছে এমনই এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন, যেখানে উঠে এসেছে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং আবেগের অজানা গল্প।


বাংলাদেশ কখনও ফুটবল বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি। কিন্তু বিশ্বকাপের সময় দেশের মানুষের উন্মাদনা দেখে সেটি বোঝার উপায় থাকে না। কোটি কোটি মানুষ নিজেদের দল হিসেবে বেছে নিয়েছে মূলত ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনাকে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরাও একই আবেগ বহন করে চলেছেন।

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে শহিদুল পার্থের স্মৃতির কথা। ছোটবেলায় গ্রামের একমাত্র সাদাকালো টেলিভিশনে আশপাশের অসংখ্য মানুষ একসঙ্গে বিশ্বকাপ দেখতেন। গোল হলেই পুরো গ্রাম আনন্দে ফেটে পড়ত। দর্শকদের চিৎকার, উচ্ছ্বাস আর খেলোয়াড়দের উদ্দেশে দেওয়া নির্দেশনা—সব মিলিয়ে সেটি ছিল যেন উৎসবের আরেক নাম।

আজ তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করলেও ব্রাজিলের প্রতি সেই ভালোবাসা অটুট। তার ভাষায়, ব্রাজিলকে সমর্থন করা মানেই যেন শৈশব আর নিজের দেশকে ফিরে পাওয়া।

বাংলাদেশে ব্রাজিল সমর্থনের ইতিহাস শুরু হয় মূলত ১৯৭০-এর দশকে। তখন ফুটবল বিশ্ব শাসন করছিলেন কিংবদন্তি পেলে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে অনেকেই ব্রাজিলের মানুষের জীবনসংগ্রামের সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে পেয়েছিলেন। দারিদ্র্যকে জয় করে পেলের বিশ্বজয়ের গল্পও সাধারণ মানুষের হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলেছিল।

এরপর আসে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ। বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রথমবারের মতো রঙিন সম্প্রচারে বিশ্বকাপ দেখার সুযোগ পান অনেক দর্শক। সেই বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার সাফল্য এবং ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয় বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে নতুন এক আবেগ তৈরি করে।

অনেকের মতে, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার সেই জয় শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ ছিল না। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ইতিহাসের কারণে বাংলাদেশের মানুষের কাছে সেটি এক ধরনের প্রতীকী বিজয় হিসেবেও ধরা দিয়েছিল। ফলে আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের ফুটবল সমর্থনের ধরন অনেকটাই প্রজন্মভিত্তিক। বয়স্কদের বড় অংশের কাছে পেলে মানেই ব্রাজিল। পরবর্তী প্রজন্ম ম্যারাডোনার কারণে আর্জেন্টিনার প্রেমে পড়ে। আর বর্তমান প্রজন্মের কাছে সেই জায়গাটি দখল করে নিয়েছেন লিওনেল মেসি।

ফুটবলপ্রেমের এই ঐতিহ্য শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যেও বিশ্বকাপ ঘিরে আয়োজন করা হয় বড় বড় ওয়াচ পার্টি। পরিবার, বন্ধু ও নতুন প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে তারা একসঙ্গে খেলা উপভোগ করেন। অনেক অভিভাবক ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের প্রিয় দলের জার্সি পরিয়ে এই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন।

প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, ১৯৮০-এর দশকের রাজনৈতিক অস্থির সময়েও ফুটবল ছিল বাংলাদেশের মানুষের জন্য স্বস্তির এক বড় মাধ্যম। সামরিক শাসনের কঠিন বাস্তবতার মাঝেও মানুষ একত্র হয়ে বিশ্বকাপ দেখতেন, কয়েক ঘণ্টার জন্য ভুলে যেতেন সব উদ্বেগ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মানুষের কাছে ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনা কেবল বিদেশি কোনো ফুটবল দল নয়। এগুলো আবেগ, স্মৃতি, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। তাই বিশ্বকাপ এলেই দেশের রাস্তাঘাট, ছাদ, মাঠ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই দেখা যায় এই দুই দলের রঙের উৎসব।

বিশ্বকাপ বদলায়, খেলোয়াড় বদলায়, প্রজন্ম বদলায়। কিন্তু বাংলাদেশিদের ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা প্রেম যেন একই রকম থেকে যায়। কারণ এই ভালোবাসা শুধু ফুটবলের জন্য নয়—এটি স্মৃতি, ইতিহাস, সংগ্রাম এবং শেকড়ের সঙ্গে এক গভীর আবেগের নাম।