ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন নিয়ে সংশয়, গোপন ছকে এগুচ্ছে প্রস্তুতি

ছবি : সংগৃহীত

এসএম ফজলুল হক

০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:১৮ পিএম

গোপন ছকে এগুচ্ছে ভোটের প্রস্তুতি বা জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হবে বহুল কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন- এমন ঘোষণা জাতির উদ্দেশে দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস। তার নেতৃত্বাধীন সরকার আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সম্ভাব্য নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণপূর্বক ঘোষণা দেওয়ায় নড়েচড়ে বসেছেন নির্বাচনসংশ্লিষ্টরা। এ ঘোষণায় জাতি আনন্দিত হলেও তা যেন কুয়াশার চাদরে ঢেকে পড়ছে ক্রমেই। নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে অস্থিরতা ও রাজনৈতিক সংঘর্ষ। গত ২৯ আগস্ট রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় গণঅধিকার পরিষদ ও জাতীয় পার্টির মধ্যে সংঘর্ষে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার অনুপ্রবেশ অনাকাঙ্ক্ষিত এই ঘটনা বৃদ্ধি করেছে রাজনৈতিক বিতর্ক ও উদ্বেগ। ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে জাতীয় সংসদের আসন্ন নির্বাচন। সচেতনমহলের ধারণা, যেভাবে ঘোলাটে হচ্ছে রাজনীতির পরিবেশ তাতে ২০০৬ এর সেই ভয়াবহ প্রেক্ষাপট আবার ফিরে আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।


পাক-ভারত সংঘাতের ইতিহাস

নির্বাচন প্রশ্নে কিছু কিছু রাজনৈতিক দল স্থানীয় সরকারব্যবস্থা নাকি জাতীয় সংসদ- কোন নির্বাচন আগে বা পরে হবে সেই বিতর্ক পুরনো হলেও নতুন করে আলোচনা ও বিভক্তি এনেছে পিআর পদ্ধতির আলোচনা। অচেনা এই থিউরির সাথে জাতি পরিচিত না থাকলেও জোরপূর্বক পরিচয় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় প্রকাশ হয়ে পড়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর বিভক্তি। যদিও এমন দাবি মেনে নেওয়ার আইনগত কোনো সুযোগ নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। পিআর পদ্ধতির নির্বাচন সাংবিধানিকভাবে সম্ভব নয় বলায় বেজায় নাখোশ প্রস্তাবকারী দলগুলো। নির্বাচন কমিশনে সর্বশেষ নিবন্ধিত প্রায় ৫৫টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে আ’লীগ নেতৃত্বাধীন বামজোটের দলগুলো ছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষত জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ইসলামি জোট এবং নবগঠিত এনসিপি প্রচলিত পদ্ধতির নির্বাচনের পক্ষে থাকলেও জনমত জরিপের ফলাফল আশানুরূপ না হওয়ায় নির্বাচনে অংশগ্রহণে তালবাহানা করছে। এতে হতাশ নির্বাচনমুখী জাতি।


২০০৬ থেকে ২০২৫ এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত প্রায় ১৯ বছর। দেশে সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহনমূলক কোন নির্বাচন না হওয়ায় হতাশাগ্রস্ত জাতির অপেক্ষার অবসান হলেও তা অস্থায়ী কিছু কিছু রাজনৈতিক দল ও জোটের ভূমিকায়। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট সরকার ক্ষমতা ছাড়ার প্রায় ২মাস পূর্বে আ’লীগ নেতৃত্বে বামজোটের হরতাল, অবরোধ, ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চরম আকার ধারণ করে চারদলীয় সরকারের শেষ দিনে। নিহত মানুষের উপর দাঁড়িয়ে আ’লীগ, যুব, ছাত্র সহযোগী দলের নেতা-কর্মীদের উন্মত্ত নৃত্যে হতভম্ব বিশ্ব ও মানবসভ্যতা।

রাজনৈতিক দলগুলোর অমিলে হানাহানির সুযোগ নেয় বহিবির্শ্বের প্রভাবশালী কিছু দেশ ও গোয়েন্দা সংস্থা। ফখরউদ্দিন আহম্মেদ ও সেনাবাহিনীর প্রধান মইনদ্দীনের নেতৃত্বে বেসামরিক মোড়কে সামরিক শাসন বিবস্ত্র করে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের। মামলা-হামলা অপপ্রচার ও আ’লীগ, বিএনপির নেতৃত্ব থেকে শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়াকে মাইনাস করে নামেমাত্র দলীয় অবস্থান করার উদ্দেশ্যে ফখর ও মইনদ্দিনের শাসন দীর্ঘ করা। অবৈধ সরকার আ’লীগের ক্ষেত্রে সফল হলেও ব্যর্থ হয় বিএনপির ক্ষেত্রে। দেশ ছাড়তে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে রাজি করতে না পারায় মামলা ও অভিযোগ ছাড়া একের পর এক আটক করা হয় শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পরিবারের সকল সদস্যকে। জিজ্ঞাসার নামে নির্মমতায় মৃত্যুপথযাত্রী শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ২ সন্তান জ্যেষ্ঠপুত্র জনাব তারেক রহমান ও কনিষ্ঠপুত্র জনাব আরাফাত রহমান কোকো এবং বেগম খালেদা জিয়া নিজেও।

২০০৮ সালে জাতীয় সংসদের পাতানো এক নির্বাচনের আয়োজনের মাধ্যমে আ’লীগকে ক্ষমতায় আনে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে প্রতিবেশী ভারত সরকার। বিরোধী এ দমনে গুম, খুন, অপহরণ, দখল-লুঠপাট, বাকস্বাধীনতা হরণ, হাজার হাজার মামলায় জর্জরিত দেশের ডানপন্থি সকল রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। ফ্যাসিট শেখ হাসিনার আ’লীগ নেতৃত্বে স্বৈরচারী বামজোট সরকার। সরকারি চাকরিতে ৫৬% কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের ২০১৩ থেকে শুরু আন্দোলন সংগ্রাম ২০২৪ সালের ব্যাপকতা সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে। দলীয় সন্ত্রাসীদের সাথে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হামলা-মামলা, গুম, খুন, অপহরণ থেকে নারী শিক্ষার্থীরা বাদ না পড়ায় ক্ষুব্ধ মানুষের সাথে যুক্ত হয় ২০০৬ সালের পর থেকে গুম, খুন, অপহরণ, জিম্মি, মামলা-হামলা, মতপ্রকাশে খুনের মহোৎসবে ক্ষুব্ধ মানুষ। বিক্ষুব্ধরূপে শিক্ষার্থীদের সাথে রাজপথে নামে কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে। ফলে পতন ঘটে ফ্যাসিস্ট সরকারের।

ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনে ৫ আগস্ট ২০২৪ শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বামজোট সরকারের পতন, দেশছাড়া হওয়ায় নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তবর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় দীর্ঘদিন পর জাতি স্বপ্ন দেখে অবাধ নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদের ১৩তম সাধারণ নির্বাচনের। জাতিকে নিরাশ করেননি ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তবর্তীকালীন সরকার। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ হলেও স্থিতিশীল নয়। ক্ষমতাসীন সরকারের অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্যে নিরপেক্ষ অংশগ্রহণমূলক নিবাচন, সংখ্যাগরিষ্ট দলের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ম পালনে সক্ষম কি সরকার?

ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তবর্তীকালীন সরকার ২০২৬ সালের ১২ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা ও প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। সংসদীয় সরকার ও নির্বাচনের প্রাণ রাজনৈতিক দল। সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বেশ কিছু দল সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান নেওয়ায় সন্দেহের দানা বাঁধছে নির্বাচন নিয়ে। দীর্ঘদিন পর জাতীয় সংসদের নির্বাচন আসন্ন হলেও উৎসাহ উদ্দীপনার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে সাধারণ মানুষের মাঝে। উৎসাহ সৃষ্টি হওয়ার মতো পরিবেশ এখনো দেশে বিদ্যমান নেই বলে অভিমত সচেতন মহলের। সংশয় নির্বাচন প্রশ্নে। জাতীয় সংসদের নির্বাচনীয় ট্রেন চললেও যাত্রী হিসাবে রাজনৈতিক দলের অনুপস্থিতিতে পুনরায় হতাশায় নিমজ্জিত জাতি। দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির বিপুল জনসমর্থনের কারণে অন্যান্য দলগুলোও ভীত, হতাশ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে।

জাতীয় সংসদের ১৩তম সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণের পক্ষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানসহ দলের নীতি-নির্ধারকরা। নির্বাচন হবে এমন বিশ্বাস চূড়ান্ত রূপ পায়নি রাজনৈতিক ও গণমানুষের মাঝে। ইতোপূর্বে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ৩০০ আসনের বিপরীতে তাদের একক প্রার্থী মনোনীত, চূড়ান্ত করার তথ্য প্রকাশিত হয়। হালনাগাদ কোনো তথ্য নেই গণমাধ্যম বা রাজনৈতিক মহলে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ঘোষিত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে রাজনৈতিক সংঘর্ষ। গত ২৯ আগস্ট আ’লীগের মত একই অপরাধের জন্য দায়ী জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধের দাবিতে ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরের নেতৃত্বে গণঅধিকার পরিষদের একটি মিছিল জাতীয় পার্টির অফিসের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময়ে দু’দলের ব্যাপক সংঘর্ষে ভিপি নুরের আহত হওয়া দুঃখজনক। সচেতন মানুষ জাতীয় পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের সংঘর্ষকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখতে চাইছেন। প্রচলিত পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা দলগুলোর শরিক গণঅধিকার পরিষদ। যে কারণে সংশয় কি ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য বা নির্ধারিত তারিখে যাতে নির্বাচন না হয় তার চেষ্টা নয় কি? জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চলমান ঘটনাপ্রবাহ তবে কি ২০০৬ সালের পুনরাবৃত্তির আগাম লক্ষণ?