সাহসী মানুষ হুমায়ূন আহমেদ

স্রোতের বিপরীতে চলতে সাহস লাগে—অদম্য সাহস। আর সেই সাহসী মানুষটিকে আমি আবিষ্কার করলাম অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে, তবে অন্য পরিচয়ে। তিনি একজন লেখক, তুমুল জনপ্রিয় লেখক—যাকে সম্বোধন করা হয় ‘বাংলা সাহিত্যের বরপুত্র’ বলে। আমি তার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠলাম।

ছবি : সংগৃহীত

আমিন মুনশি

১২ নভেম্বর ২০২৫, ০২:৫২ পিএম

‘শ্যামল ছায়া’ সিনেমাটি দেখার পর থেকেই আমার চিন্তায় ঘুরপাক খাচ্ছিল—কে এই সিনেমার স্রষ্টা? কিভাবে তিনি পারলেন স্রোতের বিপরীতে নিজেকে দাঁড় করাতে! বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তো অনেকেই অনেক ছবি বানিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা আর রাজাকারের চরিত্র নির্ধারণ করতে গিয়ে যখন সবাই একজন হুজুর বা দাড়ি-টুপিওয়ালাকে খলনায়ক হিসেবে উপস্থাপন করছেন, তখন কোন সাহসে অথবা কোন দৃঢ় তথ্যের ভিত্তিতে এই পরিচালক একজন জুব্বা পরিহিত আলেমকে নায়কের ভূমিকায় উপস্থাপন করলেন!


সংবাদমাধ্যমে হামলা গণতন্ত্রের ওপর আঘাত

স্রোতের বিপরীতে চলতে সাহস লাগে—অদম্য সাহস। আর সেই সাহসী মানুষটিকে আমি আবিষ্কার করলাম অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে, তবে অন্য পরিচয়ে। তিনি একজন লেখক, তুমুল জনপ্রিয় লেখক—যাকে সম্বোধন করা হয় ‘বাংলা সাহিত্যের বরপুত্র’ বলে। আমি তার ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠলাম।


এ কী! বাজারে তার এত বই! এত জনপ্রিয়তা! আমি অবাক হই—কীভাবে একজন মানুষ এত বই লিখতে পারেন! তিনি খাবার খান কখন, ঘুমান কখন? আমি আরও আগ্রহবোধ করি যখন খেয়াল করি তার রচনাশৈলী আমাকে টানছে। তার লেখার ভেতর খুব সহজেই হারিয়ে যাচ্ছি আমি। কল্পনায় তার গল্পের চরিত্রগুলো আমার আশেপাশে ঘুরছে।

আমি পড়তে থাকি, পড়তে থাকি। আর নিজেকে কখনো হিমু, কখনো মিসির আলী, কখনো শুভ্র ভাবতে থাকি। যদিও শুভ্র হিসেবে নিজেকে খুব বেশিদিন ভাবার সুযোগ আমাদের দেননি এই জাদুকর লেখক। আমার হঠাৎ মনে হলো, আমি যেন দিনদিন পাঠের ভেতর ডুবে যাচ্ছি। লেখকের প্রতিটি বই পড়ার তীব্র নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছি। অথচ বই পড়ার প্রতি কোনো কালেই আমার মনোযোগ ছিল না! বই পড়া যে মানুষের অভ্যাসে পরিণত হতে পারে এবং এতটা আনন্দদায়ক হতে পারে, তা আমার জানা ছিল না। এই লেখকের কল্যাণে আমি এক প্রাণবন্ত জীবনের সন্ধান পেলাম, জ্ঞানার্জনের অনুপ্রেরণা পেলাম, জীবনবোধের দীক্ষা পেলাম।

বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবনসংগ্রাম এবং চিরায়ত বাংলার প্রকৃতি, বৃক্ষ, জোছনা, বৃষ্টির কথা পড়তে পড়তে আমিও এসবের প্রেমে পড়ে গেছি। তার লেখা ‘প্রেমের গল্প’ বইটিই ছিল আমার প্রথম হুমায়ূন আহমেদ পাঠ। এরপর ‘ছায়াবীথি’, ‘শুভ্র গেছে বনে’, ‘এই বসন্তে’, ‘কিছুক্ষণ’, ‘সাজঘর’, ‘ম্যাজিক মুনশি’, ‘হিমু সমগ্র’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘যখন নামিবে আঁধার’, ‘দেয়াল’, ‘নবনী’—সহ কতগুলো বই যে পড়েছি, তার সঠিক সংখ্যা বলতে পারব না। তবে সংখ্যাটি শতকের কোটা পেরিয়েছে—এটা নিশ্চিত।

অনেকে তার রচনাকে হেয় করে দেখে—দেখুক। কেউ কেউ তার ধর্মবিশ্বাস নিয়ে কটূক্তি করে—করুক। কিন্তু ভক্ত-পাঠকের কাছে জীবিত হুমায়ূনের চেয়ে মরহুম হুমায়ূনের কদর কম নয়। এখনো পাঠক বইমেলায় গিয়ে তাকে খোঁজেন, তার প্রতিকৃতিতে অশ্রু ঝরান বিয়োগব্যথায়। নাট্যপ্রেমীরা স্মৃতিচারণ করেন তার নির্মিত নাটকের, সিনেমাপ্রেমীরা তার সৃষ্টিশীল সিনেমার অপেক্ষায় হাপিত্যেশ করেন।

একজন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ হয়েও তিনি ভুলে যাননি নিজের শেকড়কে, নিজের আত্মায় প্রোথিত বিশ্বাসকে। এ কারণেই তার পর্যবেক্ষণ ছিল নিরপেক্ষ। তিনি কোনো দল-মতের কাছে নিজেকে খাটো করেননি অন্য অনেকের মতো। কারণ, তিনি ছিলেন সাহসী। আর সাহসী মানুষ কখনো সত্য উচ্চারণে পিছপা হন না।

লেখক : সহ-প্রচার সম্পাদক, জাতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।