সমস্যায় জর্জরিত সরকার, রাজপথের আন্দোলন যেন ফ্যাশন

ছবি : সংগৃহীত

এসএম ফজলুল হক

০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৩:০৪ পিএম

দেশ ও বহির্বিশ্বে জমাটবাঁধা অসংখ্য সমস্যায় জর্জরিত ড. মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সুনামধন্য অর্থনীতিবিদ হলেও প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনুসের গলার কাঁটা হয়ে দেখা দিয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতা। সরকারি-বেসরকারি, স্বায়ত্বশাসিত, সামরিক-বেসামরিক, আমদানি-রপ্তানি প্রায় সবক্ষেত্রে সমস্যায় ঘুরপাক খাচ্ছে তাঁর নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার। আবার নিরপেক্ষ সরকারের সহনশীলতার ফায়দা নিচ্ছে কিছু দল, জোট, সমিতি বা সংগঠন। অনৈতিক সুযোগ গ্রহণকারীদের সংখ্যা অবশ্য অতি নগণ্য। বিপুলতা দেখাতে তারা ব্যবহার করছে প্রচারযন্ত্রের কারিশমা। এদিকে নির্দলীয় হওয়ায় সাংগঠনিক শক্তিহীন এই সরকার। ফলে অনৈতিক আন্দোলন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের অভাবে বেপরোয়া হয়ে যাচ্ছেতাই দাবি তোলার স্পর্ধা দেখাচ্ছে কতিপয় সংগঠন। অন্যের স্বাধীনতা রক্ষা করে নিজের স্বাধীনতা ভোগ করাকে বাক-স্বাধীনতা বলে। অথচ দেখা যাচ্ছে, তুচ্ছ বা অবৈধ দাবি নিয়েও রাজপথে নেমে যাচ্ছেন অনেকে। সমাধানের সময় বা সুযোগ পাচ্ছে না সরকার। জনবহুল রাস্তা বন্ধ করে হচ্ছে সভা-সমাবেশ, মিছিল, মানববন্ধন ইত্যাদি। এতে মারাত্মক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বিশ্লেষকরা বলছেন, কিছু হলেই রাজপথে নেমে যাওয়াটা যেন ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে এ দেশে।


সাহসী মানুষ হুমায়ূন আহমেদ

আন্দোলন সংগ্রামকারী দল, জোট, সংস্থা, ব্যানার রাস্তায় নামার ফ্যাশন এই রেওয়াজ ২০০৬ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পযর্ন্ত অপ্রত্যাশী ছিল। ছাত্র-জনতা ও বহির্বিশ্বের অপ্রকাশিত চাপে দিশেহারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি রাজনৈতিক দলকে নিষেধাজ্ঞার বিরূপ প্রভাবে আক্রান্ত হলেও সহযোগী অন্য দল নিষিদ্ধের দাবির বোঝা এতোই ভারী যে তা বহনে অক্ষম অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনেকেই রাষ্ট্রক্ষমতাকে গলার কাঁটা হিসেবে মনে করছে।

 

সরকারি চাকরিতে ৫৬% কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষাথীদের বৈধ আন্দোলনে ভীত হয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বামজোট সরকার। আন্দোলন দমনে বেছে নেয় দলের অঙ্গ ও সহযোগী শক্তি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক আন্দোলনকারীদের ওপর সরকার সমর্থিত ছাত্র, যুবলীগ হামলা, অপহরণ থেকে নারী শিক্ষার্থী বাদ না যাওয়ায় ক্ষুব্ধ অভিভাবক ও সচেতন মানুষ। ছাত্র, যুব, ও সন্ত্রাসীদের তাণ্ডব সহ্যের সীমা অতিক্রম করায় ক্ষুব্ধ হয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনকারীদের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন।

কোটা সংস্কারের আন্দোলনে দলীয় শক্তি ব্যবহারে দমন না হওয়ায় পথে নামানো হয় রাষ্ট্রীয় পুলিশ, র‌্যাব, আধাসামরিক বাহিনী। ক্ষমতাসীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কঠোর নির্দেশ দেন আন্দোলন দমনে। শুরু হয় হত্যাযজ্ঞ। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের বাড়াবাড়ি প্রকাশ্যে হত্যাযজ্ঞে ধৈর্য হারায় রাজনৈতিক প্রায় সব দল। শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ায়ে আন্দোলন করার দলীয় প্রধানদের নির্দেশে প্রকট আকার ধারণ করে আন্দোলন। আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ায় কারফিউ জারির মাধ্যমে মাঠে নামে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা। প্রতিরক্ষা বাহিনীর আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে গুলি না করার সিদ্ধান্ত ক্ষমতাসীন সরকারের বিদায়ে শেষ পেরেক হলেও বুঝতে অক্ষম সরকার।

ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট ২০২৪ পতন হয় প্রায় ১৮ বছরের দুঃশাসনের। ২০০৮ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১৬ বছরের ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও আ’লীগ নেতৃত্বাধীন বামজোট স্বৈরাচারী সরকারের পতন দেশছাড়া প্রায় নেতাকর্মী সাথে প্রজাতন্ত্রের বিপথগামী সদস্যরাও।

৮ আগস্ট ২০২৪ ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফসল হিসাবে শপথ নেন ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। আন্দোলনকারীদের বিভিন্ন দাবির সাথে অন্যতম দাবি জাতীয় সংসদের নির্বাচন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর। দেরিতে হলেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারন, নির্বাচন কমিশন সামরিক-বেসামরিক প্রায় সংস্থা নির্বাচনমুখী হলেও বন্ধ হচ্ছে না রাজপথের আন্দোলন। নতুন, নতুন বৈধ-অবৈধ নানান দাবি আদায়ের জন্য রাস্তাকে বেছে নিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। রাস্তায় নেমে প্রতিবন্ধকতা ও হট্টগোল করা যেন ফ্যাশন হয়ে গেছে বিভিন্ন দল, জোট, সংগঠন, সংস্থা, ব্যানার হাতে জনবহুল ও যানচলাচলের ব্যস্ত রাস্তা বন্ধ, অতি অল্প মানুষের উপস্থিতিতে সভা, মিছিল, মানববন্ধন। ক্ষমতাসীন সরকার নির্দলীয় হওয়ায় আন্দোলনকারীদের অনেক দাবি অবৈধ হলেও প্রতিরোধ শক্তি না থাকার সুবর্ণ সুযোগ হিসাবে ব্যবহার করছে তারা। কিছু কিছু আন্দোলনে আন্দোলনকারীর সংখ্যা এতোই নগণ্য যে, বিপুল জনউপস্থিতি দেখাতে ব্যবহার করা হচ্ছে প্রচারযন্ত্রের নানান কারিশমা। ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ-বহির্বিশ্বে দীর্ঘদিনের জমাটবাঁধা সমস্য়ায় জর্জরিত কোনঠাসা। এতো আন্দোলন-সংগ্রাম দেখে সরকার পথ হারানোর উপক্রম প্রায়।