বিজয়ী হয়েছে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার

ছবি : সংগৃহীত

আরিফ আজাদ

২৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৭:৪৭ পিএম

প্রথম আলো আর ডেইলি স্টার এই ঘটনার পর কীভাবে রেসপন্স করে এটা দেখার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। অপেক্ষা করছিলাম জনমানসে, বিশেষ করে ঢাকাইয়া মধ্যবিত্ত এবং ক্ষমতার ভরকেন্দ্র যে সকল অক্ষগুলোকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়—সেই পক্ষগুলোর প্রতিক্রিয়া বোঝার জন্য। এবং বরাবরের মতোই—প্রথম আলো আর ডেইলি স্টার বিজয়ী হয়েছে।


একুশে পদকপ্রাপ্ত ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া আর নেই

আমাকে ভুল বুঝবেন না দয়া করে৷ আমার অ্যাক্টিভিজম জীবনের শুরুর লগ্ন থেকেই আমি প্রথম আলো আর ডেইলি স্টারের একজন ক্রিটিক। আজ থেকে অনেক বছর আগে, ২০১৬ সালের এক ভয়ার্ত পরিবেশে দাঁড়িয়ে আমি লিখেছিলাম, ‘আমাদের সময়ের সবচেয়ে অন্ধকার গলিটির নাম—প্রথম আলো।’


২০১৬ সালেই ড. জাকির নায়েক ইস্যুতে গোটা দেশে প্রথম আলো আর ডেইলি স্টার পত্রিকা পুড়িয়ে, সেসব ছবি অনলাইনে প্রকাশের ক্যাম্পেইনে নেতৃত্ব দিয়েছিলাম। বারংবার, প্রথম আলোর দ্বিচারিতা, দ্বি-মুখীতা, ভণ্ডামি আর সুক্ষ্ম ইসলামবিদ্বেষ নিয়ে আলাপ করেছি। কিন্তু কখনোই, সেই ২০১২ সাল থেকে আজ অবধি, একটাবারের জন্যেও মনে হয়নি যে—প্রথম আলো আর ডেইলি স্টারের কার্যালয় ভেঙে দেওয়া, গুড়িয়ে দেওয়া কোনো কার্যকর উপায় এদেরকে থামানোর।

আপনার কী ধারণা, সদলবলে গিয়ে প্রথম আলো আর ডেইলি স্টার ভবন ভেঙে দিলেই এদের কার্যক্রম থেমে যাবে? এরা কি ভবন-নির্ভর কাজ করে? এটা কি জুতোর কারখানা কিংবা জুসের ফ্যাক্টরি যে—কেউ গিয়ে ভেঙে দিলেই কাজ মাসের পর মাস বন্ধ হয়ে পড়বে?

প্রথম আলো আর ডেইলি স্টার কাজ করে মাথা দিয়ে। আপনার যদি তাকে টেক্কা দিতে ইচ্ছে হয়, তাকে অতিক্রম করে যেতে মন চায়, যদি আপনি চান যে প্রথম আলো আর ডেইলি স্টার ব্রাত্য হয়ে পড়ুক, অপাংক্তেয় আর অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাক, তাহলে আপনাকে মাথা দিয়েই কাজ করতে হবে। লাঠিসোঁটা দিয়ে নয়। কেন আপনি আলো-স্টারকে অপছন্দ করেন? কারণ সে শব্দের মারপ্যাঁচে মিথ্যা বয়ান তৈরি করে, সংবাদকে মিসলিড করে, ইসলামবিদ্বেষ প্রমোট করে, ইসলামবিরোধী অবস্থান নেয়। দাড়িটুপিকে ভিলেন বানায়।

ওয়েল। এর সবই তো আপনার জানা। তাহলে সেসব ডকুমেন্ট আকারে প্রকাশ করেন। প্রেসক্লাবে গিয়ে সেসব প্রদর্শন করেন। সাংবাদিক সম্মেলন করে দেখান। সমাজের সুশীল অংশকে আমন্ত্রণ করে আলো-স্টারের এইসব ভণ্ডামি তুলে ধরুন। বিদেশের পত্রিকায় এদের বিরুদ্ধে লিখুন অ্যাকাডেমিক ধাঁচে।

এখন তো আর সবকিছু মেইনস্ট্রিম মিডিয়া নির্ভর নয়। দুনিয়ার সকলকে এখন রীচ করা যায়। যেকোনো জার্নালকে, যেকোনো জার্নালিস্টকে। আপনারা তুলে ধরুন যে-- আপনার দেশের সবচেয়ে বড় দুটো পত্রিকা কীভাবে আপনাদেরকে সমাজের কাছে ব্রাত্য করে রেখেছে, কীভাবে তারা ইসলামের বিরুদ্ধে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে, দেশের বিরুদ্ধে বয়ান তৈরি করে।

আপনার এসব অ্যাক্টিভিজম প্রথমদিনেই বাজিমাত করবে না। আজ ৫ জন শুনবে, কাল ১০ জন। এভাবে, ১০০, ৫০০, ১০০০ করে করে একদিন পুরো দেশে আপনার বয়ান, আপনার ডকুমেন্টেশান, আপনার কন্ঠস্বর পৌঁছে যাবে। বয়ান নির্মাণের সিলসিলাই তো এটা।

এ সবই হলো কার্যকর পদ্ধতি আলো-স্টারকে অপাংক্তেয় করার। আপনি যদি মনে করেন যে, ওয়ান ফাইন মর্নিং সবাইকে দলে দলে ছুটে যেতে দেখে আপনিও আলো-স্টারের কার্যালয়ে দুটো ইটের টুকরো ছুঁড়ে মেরে এদেরকে সমাজচ্যুত করে ফেলবেন—তাহলে সেটা ভুল। অন্তত আজকের বাস্তব দুনিয়ায়। প্রথম আলো আর ডেইলি স্টারের যারা মালিক, সেই ট্রান্সকম গ্রুপ হলো এই দেশের অন্যতম বড় ব্যবসায়ী গ্রুপ। এরকম একটা বা দুটো কেন, একশোটা দালান ভেঙে দিলেও, পরেরদিন নতুন অফিস শুরু করাটা তাদের কাছে বাঁ হাতের খেল। সেই আপনি কী না ভাবছেন—তাদের দুটো কার্যালয় ভেঙে দিতে পারলেই তারা স্তব্ধ হয়ে যাবে।

তো, প্রথম আলো আর ডেইলি স্টার কি স্তব্ধ হলো?

দেখুন, আজ পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র তাদের হয়ে কথা বলছে। সুশীল সমাজ তাদের হয়ে কথা বলছে। মানববন্ধন করছে। ঢাকাইয়া মধ্যবিত্ত তাদের জন্য দুঃখ প্রকাশ করছে। কূটনীতিপাড়া থেকে শুরু করে বিদেশের মোড়লেরা, রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দল—সবাইকে তাদের পক্ষ নিতে হলো। মাঝখান থেকে কী হলো?

মাঝখান থেকে আপনি ভিলেন হলেন৷ পুরো দেশ তো অবশ্যই, পুরো দুনিয়ার কাছে আপনি হয়ে গেলেন খলনায়ক৷ যাদের আস্কারা আর প্রশ্রয়ে আপনি এই খেলায় নেমেছেন, কিছুদিন বাদে তাদেরকেই দেখবেন প্রথম আলো আর ডেইলি স্টারের অনুষ্ঠানে অতিথির চেয়ারে, উপদেষ্টা পরিষদে, ঘরোয়া নেমতন্নে৷ তাদের নামটাই দেখেবন প্রথম আলো আর ডেইলি স্টারের সম্পাদকীয় পাতায় জ্বলজ্বল করছে। সবাই হাত ধুঁয়ে ফেলবে। হাত ধুঁতে পারবেন না কেবল আপনি—হে দাড়িটুপি ওয়ালা অতি জজবাতি ভাইটি আমার।

শত্রু যখন মাথা দিয়ে খেলে, তার সাথেও মাথা দিয়েই খেলতে হবে। শত্রু যদি লাঠি হাতে নেয়, তবে আপনাকেও কলম ছেড়ে লাঠি হাতে তুলতে হবে—তার আগে নয়। শত্রুর হাতে কলম আর আপনার হাতে যদি লাঠি দেখা যায়—সমাজ আর দুনিয়ার কাছে আপনি ওই মুহূর্তেই ত্যাজ্য হয়ে পড়েছেন। বাতিলের খাতায় যাওয়াই আপনার নিয়তি।