পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের পথে সরকার

ছবি : সংগৃহীত

নিউজ ডেস্ক

২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:২৮ পিএম

দীর্ঘ ছয় দশকের আলোচনা ও সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণে যাচ্ছে সরকার। আগামী মার্চ মাসে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা, যদিও কাজের অগ্রগতির সঙ্গে ব্যয় বাড়তে পারে।


মদ-গাঁজার আসর বসানো যাবে না এবারের পূজায়

বড় অঙ্কের ব্যয় বিবেচনায় তিনটি ধাপে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ব্যারাজ নির্মাণে আপাতত সরকারের নিজস্ব অর্থায়নেই কাজ শুরু হবে। বর্তমানে প্রকল্পে কোনো বিদেশি ঋণ নেই। তবে উন্নয়ন সহযোগীদের আগ্রহ দেখা দিলে পরিস্থিতি বিবেচনায় পরবর্তী সময়ে ঋণ নেওয়া হতে পারে। আগামীকাল রোববার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হবে।


প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের ফলে বাংলাদেশের পদ্মা নদীতে প্রবাহ কমে গিয়ে কৃষি, নৌ চলাচল, সুন্দরবন ও জীববৈচিত্র্যে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে তা থেকে সুরক্ষা মিলবে। শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ এবং প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলোতে পানিপ্রবাহ বাড়িয়ে সেচ সুবিধা সহজ করাই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।

ব্যারাজ থেকে একটি জলবিদ্যুৎ প্লান্টের মাধ্যমে প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ব্যারাজের ওপর দিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের একটি রেলওয়ে সেতু নির্মাণ করা হবে।

প্রকল্পের আওতায় নির্মাণসামগ্রীর মান যাচাইয়ের জন্য একটি ডেডিকেটেড ল্যাব স্থাপন করা হবে। নির্মাণকাজে সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিগরি সহায়তা নেওয়া হবে। সাত বছরের মধ্যে ২০৩৩ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।

পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত জানান, বর্তমান সরকারের একেবারে শেষ সময়ে এ ধরনের প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ মূলত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, একনেকে অনুমোদন হলেও প্রকল্প আদৌ বাস্তবায়িত হবে কি না তা নিয়ে সংশয় থেকে যাবে। কারণ, ভারতের সঙ্গে পানি প্রবাহ নিয়ে সমঝোতা না হলে ব্যারাজ নির্মাণ পুরো সুফল দিতে পারবে না।

সম্ভাব্যতা সমীক্ষার ভিত্তিতে রাজবাড়ী জেলার পাংশা পয়েন্টকে ব্যারাজ নির্মাণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজের মাধ্যমে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ও নিম্নপ্রবাহে পানির সুষম বণ্টন সহজ হবে।

প্রকল্পের প্রধান অবকাঠামোর মধ্যে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, যার প্রতিটির প্রস্থ ১৮ মিটার, ১৮টি আন্ডার স্লুইসগেট, নৌযান চলাচলের জন্য একটি নেভিগেশন লক এবং দুটি ফিশ পাস। ব্যারাজের ওপর দিয়ে একটি রেলসেতু ও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করাও প্রকল্পের লক্ষ্য।

প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ২৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ সম্ভব হবে। এর ফলে গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতী ও বড়ালসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে পানিপ্রবাহ ফিরবে। লবণাক্ততা কমবে, সুন্দরবনের প্রতিবেশ রক্ষা পাবে এবং স্বাদুপানির নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

এ ছাড়া প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারিত হলে কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লি প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ড. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হালনাগাদ করার পর বিভিন্ন পরামর্শ অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এতদিন কেন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়নি, তা সংশ্লিষ্টরা ভালো বলতে পারবেন, তবে এখন সবার উচিত দেশের স্বার্থে কাজ করা।