বিশ্বকাপ এলেই কেন বাড়ে সংঘাতের শঙ্কা?
গত ১১ জুন পর্দা ওঠেছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় আয়োজিত এবারের আসরকে ঘিরে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনাও তুঙ্গে। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের পতাকায় ছেয়ে গেছে সড়ক, বাড়ির ছাদ ও খোলা মাঠ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে প্রিয় দলকে ঘিরে তর্ক-বিতর্ক, সমর্থন আর শুভকামনার বন্যা।

ছবি : সংগৃহীত
১৪ জুন ২০২৬, ০৮:৪৫ পিএম
বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হলেই যেন বদলে যায় বাংলাদেশের চেনা দৃশ্যপট। শহর থেকে গ্রাম, অলিগলি থেকে মহাসড়ক—সবখানেই উড়তে থাকে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, পর্তুগাল কিংবা ফ্রান্সের পতাকা। যদিও বাংলাদেশের জাতীয় দল এখনো বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিতে পারেনি, তবুও ফুটবলকে ঘিরে এ দেশের মানুষের আবেগ, উচ্ছ্বাস ও সমর্থনের গভীরতা বিশ্বব্যাপী আলোচিত।
প্রয়োজনে ৫ কোটি টাকা বহনেও বাধা নেই: ইসি সচিব
গত ১১ জুন পর্দা ওঠেছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় আয়োজিত এবারের আসরকে ঘিরে বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের উন্মাদনাও তুঙ্গে। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের পতাকায় ছেয়ে গেছে সড়ক, বাড়ির ছাদ ও খোলা মাঠ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে প্রিয় দলকে ঘিরে তর্ক-বিতর্ক, সমর্থন আর শুভকামনার বন্যা।
বাংলাদেশের সঙ্গে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার সরাসরি কোনো ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা ফুটবল সংস্কৃতি এ দুই দেশের প্রতি বিশেষ আবেগ তৈরি করেছে। পেলের শিল্পসম্মত ফুটবল, দিয়েগো ম্যারাডোনার কিংবদন্তি ক্যারিয়ার এবং বর্তমান প্রজন্মে লিওনেল মেসি ও নেইমারের জনপ্রিয়তা সেই আবেগকে আরও শক্তিশালী করেছে।
বিশ্বকাপ এলেই শুরু হয় সমর্থকদের মধ্যে এক নীরব প্রতিযোগিতা। কে বড় পতাকা টাঙাবে, কার দলের সমর্থক বেশি—এসব নিয়ে চলে আলোচনা ও আনন্দঘন প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কখনো কখনো তা রূপ নেয় ব্যতিক্রমী ঘটনাতেও। শরীয়তপুরে একদল তরুণ ঘোষণা দিয়েছেন, ব্রাজিল আবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ না পাওয়া পর্যন্ত তারা বিয়ে করবেন না। অন্যদিকে ৭২ বছর বয়সী আমজাদ হোসেন নিজের জমির একটি অংশ বিক্রি করে প্রায় ৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ জার্মানির পতাকা তৈরি করেছেন, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও আলোচনা হয়েছে।
বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেম এতটাই ব্যতিক্রমী যে, বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া বিভিন্ন দেশের নজরও কাড়ে। এবারের আসরে ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা নরওয়ে বাংলাদেশের সমর্থকদের নিজেদের পক্ষে টানতে বিশেষ প্রচারণা চালিয়েছে। দেশটির দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশিদের উদ্দেশে বার্তা দিয়ে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, স্বাধীন বাংলাদেশের স্বীকৃতিদাতা প্রথম দিকের দেশগুলোর একটি ছিল নরওয়ে।
তবে ফুটবল উন্মাদনার এই রঙিন চিত্রের আড়ালে রয়েছে কিছু উদ্বেগজনক ঘটনাও। প্রিয় দলকে ঘিরে উত্তেজনা অনেক সময় সংঘর্ষ ও সহিংসতায় রূপ নেয়। বিভিন্ন গবেষণা ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের বিশ্বকাপ চলাকালে প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের সংঘর্ষে বাংলাদেশে অন্তত ২৩ জন নিহত হন। এছাড়া পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে একাধিকবার।
২০১৪ সালে বৈদ্যুতিক তারে পতাকা লাগাতে গিয়ে অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়। ২০১৮ সালে ব্রাজিলের পতাকা টাঙানোর সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারায় এক ১২ বছর বয়সী শিশু। একই বছর সমর্থকদের মিছিলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে।
বিশ্বকাপ ফুটবল বাংলাদেশের মানুষের কাছে কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি আবেগ, উৎসব এবং সামাজিক সম্পৃক্ততার এক অনন্য উপলক্ষ। ২০২২ সালের বিশ্বকাপের সময় বাংলাদেশের সমর্থকদের ভালোবাসা নিয়ে ফিফা ও আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের খেলোয়াড়রাও প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছিলেন, যা বিশ্বমঞ্চে দেশের ফুটবলপ্রেমকে নতুন করে পরিচিত করে তোলে।
বিশ্বকাপের উন্মাদনায় মেতে ওঠা বাংলাদেশে ফুটবল আজ এক সামাজিক সংস্কৃতির নাম। তবে সেই আবেগ যেন কখনো বিদ্বেষ, সংঘাত বা প্রাণহানির কারণ না হয়—এমন প্রত্যাশাই সচেতন নাগরিকদের। খেলার সৌন্দর্য, সম্প্রীতি ও আনন্দই হোক বিশ্বকাপ উৎসবের মূল বার্তা।


